গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যায় ধরা পড়া ‘স্বাধীন’ আসলে পাবনার সেলিম, বাবার নামও পাল্টেছিলেন

গাজীপুরে সাংবাদিক তুহিন হত্যায় ধরা পড়া ‘স্বাধীন’ আসলে পাবনার সেলিম, বাবার নামও পাল্টেছিলেন

গাজীপুর মহানগরের চন্দনা চৌরাস্তা এলাকায় ভিডিও ধারণ করায় সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিনকে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগে আটক সাতজনের অন্যতম ‘স্বাধীন’ নামে পরিচিত যুবকটির প্রকৃত নাম সেলিম (২৮)। পাবনার ফরিদপুর উপজেলার সোনাহারা গ্রামের বাসিন্দা এই সেলিম নিজের পরিচয় গোপন করতে গাজীপুরে এসে নাম বদলে নেন, এমনকি বাবার আসল নাম জামাল উদ্দিন বদলে রাখেন নুর মোহাম্মদ। পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য নিশ্চিত করেছে অনলাইন পোর্টাল risingbd। শনিবার (৯ আগস্ট) আদালতে তোলা হলে বিচারক সাত আসামির প্রত্যেককে দুই দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন। হামলার পেছনে হানিট্রাপের মাধ্যমে ছিনতাইয়ের ব্যর্থ চেষ্টা এবং নিহত সাংবাদিকের ভিডিও ডিলিট না করার দৃঢ়তার কথা উল্লেখ করছে তদন্ত সংস্থা।

পটভূমি

গত বৃহস্পতিবার দুপুরে চন্দনা চৌরাস্তা এলাকায় একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা তুলে ফিরছিলেন বাদশা নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ আছে, আগে থেকে ওতপেতে থাকা গোপালী ও তার সহযোগীরা ‘হানিট্রাপ’ কৌশলে বাদশাকে ফাঁদে ফেলতে চাইলে বিষয়টি বুঝে ফেলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। তখনই দুর্বৃত্তরা ধারাল অস্ত্র নিয়ে তাকে ধাওয়া করে। সাংবাদিক তুহিন রাস্তার পাশ থেকে পুরো ঘটনা মোবাইলে ধারণ করছিলেন। ভিডিও ডিলিট করতে বললেও রাজি না হওয়ায় হামলাকারীরা তুহিনের ওপর চড়াও হয় এবং প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে পালিয়ে যায়।

ঘটনাপ্রবাহ

খুনের পরদিনই গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) টঙ্গী, বাসন ও কোনাবাড়ি এলাকায় অভিযান চালিয়ে সাতজনকে গ্রেপ্তার করে। ধরা পড়াদের মধ্যে ‘স্বাধীন’ বিশেষভাবে নজরে আসে, কারণ তার জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা হয়রাপূর্ণ তথ্য পুলিশের সঙ্গে মেলে না। স্থানীয় ইউপি সদস্য মজিবুর রহমান সরকার মজনু risingbd-কে জানান, পাবনা গ্রামের বখাটে হিসেবে পরিচিত সেলিম প্রাথমিক বিদ্যালয় ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে নানা অপরাধে যুক্ত ছিল। নিজের পরিচয় আড়াল করতেই গাজীপুরে নতুন নাম নিয়ে বেড়াচ্ছিল। একই মামলায় পাবনার আরেক তরুণ ফয়সাল হাসান ওরফে রমজান (২৩) ধরা পড়েছে, যিনি দীর্ঘদিন গাজীপুরের একটি গার্মেন্টে থাকা বাবার কাছে ওঠাবসা করতেন।

প্রতিক্রিয়া

সাংবাদিক সমাজ হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ও কর্মস্থলে নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ তুলে দ্রুত বিচার দাবি করেছে। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এক বিবৃতিতে লিখেছে, “স্রেফ পেশাগত দায়িত্ব পালনের অপরাধে একজন সাংবাদিকের প্রাণ যেতে পারে—এটি গণমাধ্যমের জন্য অশনি সঙ্কেত।” গাজীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মেরাজ উদ্দিন বলেন, “এই শহরে ছিনতাই ও মাদকচক্রের বিরুদ্ধে বারবার রিপোর্ট করেছেন তুহিন। তাঁর মৃত্যু তদন্তে গাফিলতি বরদাশত করা হবে না।”

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

৭ – মোট গ্রেপ্তার আসামি

২ – প্রত্যেক আসামির রিমান্ডের মেয়াদ (দিন)

২৫,০০০ টাকা – ভুক্তভোগী বাদশার ব্যাংক থেকে উত্তোলিত অর্থ

১৫ বছর – সেলিম ওরফে স্বাধীনের বাবার (জামাল উদ্দিন) পরিবার ছেড়ে থাকার মেয়াদ

৪-৫ শ্রেণি – সেলিমের সর্বোচ্চ শিক্ষা

ভিডিও ফুটেজ – হত্যাকাণ্ডের প্রধান সাক্ষ্য, যা ডিলিট করতে অস্বীকৃতির জেরে তুহিন নিহত হন

এরপর কী

দুই দিনের রিমান্ডে সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদে হামলার পরিকল্পনা, অস্ত্রের উৎস ও বড় কোনো অপরাধচক্রের যোগসূত্র আছে কি না, তা বের করার চেষ্টা করছে জিএমপি। তদন্তে প্রয়োজন পড়লে আরও রিমান্ড আবেদন করা হবে বলে জানান বাসন থানার ওসি মালেক খসরু। গোপন পরিচয় বদলে অপরাধীর চলাচল কীভাবে এত সহজ হল, সেই প্রশ্নে স্থানীয় প্রশাসন জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই-প্রক্রিয়া কঠোর করার আশ্বাস দিয়েছে। এদিকে নিহত তুহিনের পরিবার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটি স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছে।

বৃহত্তর চিত্র

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের দ্রুত নগরায়ণ ও শ্রমজীবী ভিড়ের আড়ালে নানা অপরাধচক্র গড়ে উঠেছে। গত এক বছরে মহানগরীতে ব্যাংকপথের গ্রাহকের ওপর অন্তত ১২টি ছিনতাই ও দু’টি হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, পরিচয় বদলে বিভিন্ন জেলা থেকে অপরাধীরা সহজেই এখানে গা-ঢাকা দেয়; সেলিম ওরফে স্বাধীনের ঘটনা সেই ফাঁকই উজ্জ্বল করেছে। গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা বাড়াতে থানাভিত্তিক ‘ফাস্ট রেসপন্স ইউনিট’ গড়ার প্রস্তাব এসেছে সাংবাদিক সংগঠনগুলোর কাছ থেকে।

শেষ কথা

একটি ভিডিও ফুটেজ মাত্র কয়েক সেকেন্ডের, কিন্তু তা জনসমক্ষে এলে অপরাধীর সাজা নিশ্চিত করতে পারে—এ বাস্তবতা জানত বলেই দুর্বৃত্তরা সাংবাদিক তুহিনকে থামাতে চেয়েছিল। পেশাদারিত্ব রক্ষার মূল্য তাঁকে প্রাণ দিয়ে দিতে হয়েছে। সেলিমের ভুয়া পরিচয় উন্মোচন দেখিয়ে দিচ্ছে, সঠিক তথ্য যাচাই ও দ্রুত বিচার না হলে এমন অপরাধীরা বারবার নতুন নামে ফিরবে। তাই বিচার-প্রক্রিয়ার গতি এবং নাগরিক পরিচয়ব্যবস্থার জবাবদিহিতা—দুটিই এখন পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে।

More From Author

শিশুদের স্ক্রিন টাইম নিয়ে আতঙ্কের কতটা ভিত্তি আছে, বলছেন গবেষকেরা

বলিউডে নতুন প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠছেন রাশা থাডানি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *