অচলা সচদেব: বলিউডের নীরবে হারিয়ে যাওয়া এক ঝলমলে নায়িকার গল্প
রাজ কাপুর, দেব আনন্দ, যশ চোপড়া থেকে শুরু করে আধুনিক ‘ডিডিএলজে’—বলিউডের প্রায় সাত দশকের জনপ্রিয় ছবিতে অনায়াস উপস্থিতি ছিল অচলা সচদেবের। কিন্তু পর্দার উজ্জ্বল জীবন শেষে অভিনেত্রীটি নিজের শেষ ১২ বছর কাটিয়েছেন পুনের একটি দুই কামরার ফ্ল্যাটে একেবারে একা; ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে, মেয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ২০১2 সালের ৩০ এপ্রিল পুনে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯১ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগেই ফ্ল্যাটটি ও সঞ্চয় তিনি দান করে যান জনসেবা ফাউন্ডেশনকে। সেই ফাউন্ডেশন এখন ‘অচলা সচদেব ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন’ চালায়, যেখানে পাহাড়ি ও আদিবাসী তরুণ–তরুণীদের স্বাস্থ্যসেবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাঁর গল্প আবার মনে করিয়ে দিল—গ্ল্যামারের আলোর নিচে নীরবে কত শিল্পী বার্ধক্যের অবহেলায় ডুবে যান।
পটভূমি
১৯২০ সালে অবিভক্ত ভারতের পেশোয়ারে জন্ম নেওয়া অচলা সচদেবের অভিনয় শুরু আকাশবাণী দিল্লি ও লাহোর কেন্দ্রে ঘোষিকা হিসেবে। ১৯৫০-এর ‘দিলরুবা’ ছবিতে দেব আনন্দের বোনের চরিত্র তাঁর চলচ্চিত্রযাত্রার সূচনা করে। এরপর ‘মেরা নাম জোকার’, ‘ফুটপাত’, ‘ওয়াক্ত’, ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে যায়েঙ্গে’, ‘কভি খুশি কভি গম’—শতাধিক ছবিতে নানা প্রজন্মের তারকাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ১৯৬৫ সালের ‘ওয়াক্ত’-এর আইকনিক গান ‘আয়ে মেরি জোহরা জবীন’-এ যাঁকে নায়িকা হিসেবে দর্শক দেখেন, সেটিও অচলা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মা, দাদি, ঠাকুমির চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নিলেও তার স্বর, উচ্চারণ আর সফিস্টিকেটেড উপস্থিতি তাঁকে আলাদা মাত্রা দিত।
ঘটনাপ্রবাহ
৭০-এর দশকের মাঝামাঝি কর্মজীবন থামিয়ে তিনি পুনেতে চলে যান এবং ব্রিটিশ নাগরিক ক্লিফোর্ড ডগলাস পিটার্সকে বিয়ে করেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকেই নিঃসঙ্গতা চেপে বসে। ছেলে জ্যোতিন পিটার্স যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয় আগেই। পাশে ছিল কেবল জনসেবা ফাউন্ডেশনের নিযুক্ত একজন সেবিকা। শেষ কয়েক মাস পুনে হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও চলচ্চিত্র-সম্পর্কিত কেউ殷 এসে দেখেননি। মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে অংশ নেন মাত্র কয়েকজন আত্মীয় ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা ছেলে।
বৃহত্তর চিত্র
অচলা সচদেবের পরিণতি নিঃসঙ্গতার সেই তালিকায়—যেখানে আছেন সংগীত পরিচালক ও.পি. নায়্যার, অভিনেতা ভরত ভূষণ, নৃত্যশিল্পী ভগবান দাদা প্রমুখ। সেলুলয়েড যখন তাদের আর দরকার মনে করে না, তখনই শুরু হয় অদৃশ্য হওয়ার অধ্যায়। সমাজকল্যাণ ভাতা বা বয়স্ক শিল্পীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার মতো নীতিগত সুরক্ষা ভারতে সীমিত। ফলে শারীরিক সামর্থ্য শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের জীবিকা ও চিকিৎসা—দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অচলা সচদেবের উদাহরণ দেখায়, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও শেষ সম্বল দান করার আগেও একজন শিল্পীকে ভাবতে হয়, বার্ধক্যে কে পাশে দাঁড়াবে।
প্রতিক্রিয়া
অমিতাভ বচ্চন ও প্রযোজক একতা কাপুর টুইট করে শ্রদ্ধা জানালেও ইন্ডাস্ট্রির বড় অংশই নীরব ছিল। বন্ধু রাজীব নন্দা ‘মুম্বাই মিরর’-কে বলেন, ‘শেষ দিকে উনি ফোন করলেও অনেকে ব্যস্ততার অজুহাতে রিসিভ করতেন না।’ চলচ্চিত্র সমালোচক অনুপমা চোপড়া মনে করেন, ‘ইন্ডাস্ট্রি বংশপরম্পরায় পরিবারকেন্দ্রিক। যার নিজের দল নেই, বার্ধক্যে তাঁর খোঁজ নেওয়ার লোকও থাকে না।’ সমাজকর্মীরা বলছেন, প্রবীণ শিল্পীদের জন্য পেনশন, আবাসন ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারি স্তরে উদ্যোগ জরুরি।
শেষ কথা
পর্দায় যিনি কোটি দর্শককে হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন, তাঁর জীবনের শেষ পাতায় ছিল নীরবতা আর হাসপাতালের সাদা দেয়াল। তবু শেষ সিদ্ধান্তে অচলা সচদেব মানবসেবাকে বেছে নিয়েছেন—নিজের ফ্ল্যাট, সঞ্চয় এবং নাম রেখে গেছেন দরিদ্র পাহাড়ি তরুণদের উন্নয়নে। তাঁর গল্প হয়তো আর একবার প্রশ্ন তোলে—সব আলো নিভে গেলে শোবিজ তারকাদের জন্য আমরা কী প্রস্তুত রেখেছি? স্মৃতিচারণ নয়, ব্যবস্থা—সম্মান নয়, নিরাপত্তা—হয়তো সেটাই হবে এই নিঃসঙ্গ নায়িকার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা।

