মুন্সীগঞ্জে কুখ্যাত মাদক সম্রাট ‘লিটন কসাই’ গ্রেফতার, ইয়াবা চক্রে ভাঙন

মুন্সীগঞ্জে কুখ্যাত মাদক সম্রাট ‘লিটন কসাই’ গ্রেফতার, ইয়াবা চক্রে ভাঙন

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় বহুল আলোচিত মাদক কারবারি লিটন কসাই (৪০) অবশেষে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন। রোববার (১০ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টায় ভবেরচর ইউনিয়নের আনারপুরা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় গোপন অভিযানে তাকে আটক করা হয়। ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, অস্ত্র ও হত্যা–মিলিয়ে ২০০৮-২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হয়েছে; পাঁচটিতে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছিল। পুলিশ জানায়, কসাইখানা ও মাছের ব্যবসার আড়ালে তিনি ২০-২৫ জন সহযোগী নিয়ে নদীপথে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা এনে ঢাকাসহ আশপাশে সরবরাহ করতেন। মাদক অর্থে তিনটি দোতলা বাড়ি ও দামি গাড়ি কিনে এলাকায় ‘গজারিয়ার ইয়াবা বদি’ নামে পরিচিত হন। গ্রেফতারের খবরে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অভিভাবকেরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেও তার পুরো নেটওয়ার্ক ভাঙতে পুলিশকে আরও অভিযান চালাতে হবে বলে মত বিশ্লেষকদের।

মূল তথ্য

গ্রেফতার হওয়া লিটন কসাইয়ের বাড়ি ভবেরচর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামে। পুলিশ জানায়, মাদক নিয়ন্ত্রণ আইনে আটটি, হত্যা দুটি, অস্ত্র দুটিসহ মোট ১৫টি মামলা তার বিরুদ্ধে চলমান। এর মধ্যে সর্বশেষ ইয়াবা মামলায় আদালত পাঁচবার গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেও তাকে পায়নি। রোববারের অভিযানে পুলিশ গোপনে আসা তথ্য ধরে আনারপুরা বাসস্ট্যান্ড ঘিরে ফেলে। মোবাইল টিমের সামনে পড়তেই লিটন পালানোর চেষ্টা করেন, তবে পাঁচ মিনিটের ধাওয়া শেষে তাকে আটক করা হয়। সঙ্গে থাকা মোবাইল থেকে লেনদেনের বেশ কিছু তথ্য মিলেছে, যা ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বলে ওসি আনোয়ার আলম আজাদ নিশ্চিত করেন।

প্রেক্ষাপট

গজারিয়ায় নদীপথ আর সড়কপথ মিশে যাওয়ায় অঞ্চলটি মাদক পাচারকারীদের জন্য চৌরাস্তা হিসেবে পরিচিত। পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিটন কসাই ২০১২ সালে প্রথম কসাইখানার আড়ালে ইয়াবা সরবরাহ শুরু করেন। এরপর নদীপথে বড় চালান এনে কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জে ছোট ছোট ডিলারের হাতে তুলে দিতেন। ব্যবসা বেড়ে গেলে মাছের খামার কিনে সেখানে গোপন গুদাম বানান। স্থানীয় সূত্র বলছে, মাত্র কয়েক বছরে তিনি তিনটি দোতলা বাড়ি, একটি মাছের ঘের ও দুইটি বিলাসবহুল প্রাইভেট কারের মালিক হন, যার কোনো আইনগত উৎস দেখাতে পারেননি।

প্রতিক্রিয়া

ভবেরচর বাজার ব্যবসায়ী সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, 'লিটনের কারণে স্কুলপড়ুয়া ছেলেরা পর্যন্ত ইয়াবার হাত থেকে রেহাই পায়নি। তাকে ধরায় আমরা মুক্তির অনুভূতি পাচ্ছি।' জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, 'শুধু লিটন নয়, তার সহযোগীরাও আইনের আওতায় আসবে।' অন্যদিকে লিটনের পরিবারের একজন সদস্য দাবি করেছেন, 'সব অভিযোগ রাজনীতির কারণে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে'—যা পুলিশ অস্বীকার করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গ্রেফতারের খবর ছড়িয়ে পড়লে বহু netizen পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

বৃহত্তর চিত্র

লিটনের গ্রেফতারের দিন সিলেটে ১৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক ব্যক্তি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সেনা-পুলিশের অভিযানে এক হাজারের বেশি ইয়াবা এবং চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় অস্ত্র-ইয়াবাসহ আরেকজন ধরা পড়েছেন। আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকেরা বলছেন, কয়েকটি জেলা মিলিয়ে এক দিনে এতগুলো সফল অভিযানই প্রমাণ করছে যে সরকার সাম্প্রতিক মাদক বিরোধী অভিযান জোরদার করেছে। একই দিনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জনস্বার্থে নয়জন সাবেক ওসি-কে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে, যা পুলিশ বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এসব পদক্ষেপ মিলে মাদক ও দুর্নীতি বিরোধী বার্তা স্পষ্ট করছে বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষক মোহাম্মদ ইমরান হোসেন।

পরবর্তী পদক্ষেপ

গজারিয়া থানা পুলিশ লিটনের সাত দিনের রিমান্ড চাইতে সোমবার আদালতে আবেদন করবে। পাশাপাশি তার অলিখিত সম্পত্তির তালিকা তৈরি করে দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, লিটনের মোবাইল নম্বর ও নগদ লেনদেন বিশ্লেষণ করে তার ২০-২৫ সদস্যের সহযোগী চক্রের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে; শিগগিরই সমন জারি হবে। স্থানীয় প্রশাসন এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সভা ও স্কুলে মাদকবিরোধী ক্যাম্পেইন চালানোর ঘোষণা দিয়েছে। পুলিশ-সিভিল সমাজ একযোগে কাজ করলে গজারিয়ায় দীর্ঘদিনের ইয়াবা নেটওয়ার্ক ভেঙে ফেলা সম্ভব বলে কর্মকর্তারা আশাবাদী।

More From Author

প্রেসক্লাব উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি: কৃষকদল নেতা মাসুদ রানার বহিষ্কার

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির ১০ দিনের ভর্তি মেলা শুরু, কোর্স ফিতে সর্বোচ্চ ১০০% ছাড়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *