বনের ভেতর অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগে হাতি হত্যা ও বন দখল বাড়ার আশঙ্কা

বনের ভেতর অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগে হাতি হত্যা ও বন দখল বাড়ার আশঙ্কা

চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও দিনাজপুরের বনাঞ্চলে ১০ হাজারের বেশি অবৈধ বিদ্যুৎ-খুঁটির খোঁজ পেয়েছে বন অধিদপ্তর। সর্বাধিক ৫ হাজার ৭১৭টি খুঁটি বসেছে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগে। ২০১৬ সাল থেকে এসব লাইনের মাধ্যমে অন্তত ২৬টি বন্য হাতি বিদ্যুৎ ফাঁদে পড়ে মারা গেছে। বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদেরা বলছেন, অবৈধ সংযোগের কারণে বন দখল বেড়েছে, বন্য প্রাণী ঝুঁকিতে পড়েছে, আর প্রশাসনের সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতি জটিল করছে। বন বিভাগ বেশ কয়েকবার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পবিস) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি) চিঠি দিলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এখন জ্বালানি উপদেষ্টা পর্যায়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন ও জরুরি অভিযানের দাবি উঠেছে।

প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে বনভূমি মোট ভূখণ্ডের মাত্র ১১ শতাংশ। তাও রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে পর্যটন, বসতি ও কৃষি সম্প্রসারণের চাপে। সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যায়, পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ-খুঁটি বসিয়ে অবৈধ ঘরবাড়ি গড়ে তোলা হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে বসবাস স্থায়ী হয়, পরে রাস্তা, দোকান, কৃষিজমির দাবি ওঠে। ফলে আইনগতভাবে সংরক্ষিত বন দ্রুত সঙ্কুচিত হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• ১০,00০+ অবৈধ খুঁটির অবস্থান চিহ্নিত

• ৫,৭১৭টি শুধু কক্সবাজার উত্তরে

• ৮ বছরে ২৬টি হাতি বৈদ্যুতিক ফাঁদে নিভে গেছে

• দেশে মোট বনভূমি ১১% এর ঘরেই সীমাবদ্ধ

প্রতিক্রিয়া

পবিসের এক পরিচালক প্রথম আলোকে বলেছেন, "জাতীয় পরিচয়পত্র ও একটি ফরম পূরণ করলেই আমরা সংযোগ দেই, বন বিভাগের আপত্তি সম্পর্কে মাঠকর্মীদের ধারণা কম।" বিপরীতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, "প্রতিটি সংযোগের আগে আমাদের অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে, কিন্তু ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই তা মানা হয় না।" বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা) বলছে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ও বন আইন অনুযায়ী এ ধরনের স্থাপনা ৩ থেকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের যোগ্য অপরাধ; কিন্তু দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই মামলা করতে গড়িমসি দেখা যায়।

বিশ্লেষণ

বিদ্যুৎ সংযোগ যেমন নাগরিক অধিকার, তেমনি বন ও বন্য প্রাণ সংরক্ষণও সংবিধানস্বীকৃত দায়িত্ব। সমস্যা হল, বিদ্যুৎ বিভাগ দ্রুত লাইনের সংখ্যা ও রাজস্ব বাড়াতে চায়, আর বন বিভাগ লোকবল ও রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবে পিছিয়ে থাকে। সেই ফাঁকেই দখলদার চক্র বন কেটে প্লট তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদ্যুতের খুঁটি সরানো সহজ কাজ নয়—তার সঙ্গে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং ভোটের সমীকরণ জড়িত। ফলে প্রশাসনিক চিঠি অবশেষে ধুলোয় পড়ে থাকে, বন উজাড় হয়।

পরবর্তী পদক্ষেপ

• জ্বালানি ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টা দপ্তরের অধীনে আন্তঃমন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন ও ৯০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশ।

• অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নে যৌথ অভিযান; পিডিবি, পবিস, বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট পরিচালনা।

• নতুন সংযোগের আগে ডিজিটাল অনুমোদন প্ল্যাটফর্ম, যাতে বন বিভাগের অনাপত্তি সনদ যুক্ত না থাকলে বিদ্যুৎ মিটার জারি না হয়।

• বন্য হাতি করিডোর চিহ্নিত এলাকায় উচ্চভোল্টেজ নয়, সৌরভিত্তিক বিকল্প আলোকসজ্জা পাইলট প্রকল্প।

• মাঠপর্যায়ে বন রক্ষায় কমিউনিটি প্যাট্রল ও ক্ষতিপূরণ তহবিল বাড়ানো।

শেষ কথা

বনকে বাঁচানো মানে শুধু গাছ নয়, জীববৈচিত্র্য, পানি, মাটি ও সামগ্রিক প্রতিবেশ টিকিয়ে রাখা। অবৈধ বিদ্যুৎ-লাইনের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতার ঘোষণা কাগজে থাকলেই হবে না; সেটি মানুষ ও হাতি—উভয়ের জীবন রক্ষার প্রশ্নে মাঠে কার্যকর করতে হবে।

More From Author

পাকিস্তানের বিপক্ষে ছয় বছর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজের জয়, সিরিজে ১–১ সমতা

দিল্লিতে নির্বাচন কমিশন ঘেরাওয়ের আগে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী আটক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *