পাঁচ শ্রেণির করদাতাকে অনলাইন রিটার্নে ছাড় দিল এনবিআর
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সোমবার এক বিশেষ আদেশে ঘোষণা করেছে, পাঁচ ধরনের ব্যক্তি করদাতাকে এবার বাধ্যতামূলক অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিলের বিধান থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। ছাড় পাওয়া শ্রেণিগুলো হলো ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণ, প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি, মৃত করদাতার পক্ষে আইনগত প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক। অন্যান্য সব করদাতাকে ৩১ অক্টোবরের মধ্যে www.etaxnbr.gov.bd পোর্টালের মাধ্যমে ই–রিটার্ন জমা দিতেই হবে। ই–রিটার্ন সিস্টেমে নিবন্ধনে সমস্যা দেখা দিলে নির্দিষ্ট যুক্তিসহ উপকর কমিশনারের কাছে আবেদন করে কাগুজে রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। গত বছর সীমিত পরিসরে চালু ব্যবস্থায় ১৭ লাখের বেশি মানুষ অনলাইনে রিটার্ন দিয়েছিলেন, এবার সেই পরিসর আরও বাড়ছে।
প্রেক্ষাপট
গত ৩ আগস্ট এনবিআর ঘোষণায় প্রথমবারের মতো দেশের সব ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। সরকারের লক্ষ্য ছিল কর ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তর ও স্বচ্ছতা আনা। তবে সরেজমিনে দেখা যায়, প্রবীণ ও ডিজিটাল সক্ষমতা–বঞ্চিত করদাতাদের জন্য নতুন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন কর অঞ্চলে লাইনে দাঁড়িয়ে সহায়তা চাইতে থাকা সিনিয়র নাগরিকদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে করদাতাদের চাপ ও ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করে সোমবারের (১২ আগস্ট) বিশেষ আদেশে এই পাঁচ শ্রেণির জন্য বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হলো।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• গত বছর অনলাইনে রিটার্ন দাখিলকারী করদাতা: ১৭ লাখ ২০ হাজার (এনবিআর তথ্য)।
• নতুন পোর্টাল www.etaxnbr.gov.bd আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন: জুলাই ২০২۳।
• চলতি অর্থবছরের রিটার্ন জমার শেষ তারিখ: ৩১ অক্টোবর ২০২৪।
• কাগুজে রিটার্নের জন্য আবেদন করতে হবে: একই সময়সীমার মধ্যে, যুক্তিসহ আবেদন করে সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত/যুগ্ম কর কমিশনারের অনুমোদন নিতে হবে।
• অনলাইন যেকোনো সময় কর পরিশোধে সমর্থ পেমেন্ট মাধ্যম: ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, রকেট, নগদ ইত্যাদি।
এর গুরুত্ব কী
দেশে মোট এক কোটি ২৯ লাখ টিআইএনধারীর মধ্যে রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪৮ লাখের মতো। কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তুলতে পারলে ফাঁকফোকর কমে, রাজস্ব বাড়ে এবং করদাতার হয়রানি কমে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার সক্ষমতা সবার এক নয়। এনবিআরের সাম্প্রতিক ছাড় সাম্য ও অন্তর্ভুক্তির দিকটি তুলে ধরেছে—বিশেষ করে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের ক্ষেত্রে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পক্ষে স্থানীয় ঠিকানায় ওটিপি বা সাইন-ইন সমস্যা ছিল; নতুন সিদ্ধান্তে তাদের ঝামেলা কমবে। একই সঙ্গে উদ্যোগটি মূল ধারার করদাতাদের অনলাইনে নিয়ে যাবার পরিকল্পনাও স্থির রেখেছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বয়ংক্রিয় কর ব্যবস্থাপনার ভিত্তি তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
কর আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি তৈমুর রেজা বলেন, “ডিজিটাল রিটার্নের উদ্দেশ্য ঠিক, কিন্তু বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত সহায়তা না দিলে হিতে বিপরীত হতে পারে।” প্রবীণ করদাতা নাজমা খাতুন (৭০) প্রথম আলোকে জানান, নতুন পদ্ধতি বোঝার জন্য তিনি ‘সহায়তা কেন্দ্রে’ গিয়ে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। একদিকে এই অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে কাগুজে বিকল্প–দুটি পথই এখন উন্মুক্ত থাকায় স্বস্তি পেয়েছেন বলে জানান তিনি। গবেষণা সংস্থা সিপিডি’র ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খানের মতে, ধীরে ধীরে বাধ্যতামূলক অনলাইন রিটার্নের আওতা বাড়ানো ঠিক ব্যবস্থা, তবে ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার দিকে নজর না দিলে কর বিস্তৃতি থমকে যেতে পারে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
অনলাইন রিটার্ন জমাতে ই-টিআইএন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে পোর্টালে নিবন্ধন করতে হবে। যাদের পরিচয় মিলছে না বা ওটিপি পাচ্ছেন না, তারা ৩১ অক্টোবরের মধ্যে উপকর কমিশনার বরাবর আবেদন করে কাগুজে রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। কর অঞ্চল ও নির্বাচন করা ব্যাংকে স্থাপিত ‘রিটার্ন সহায়তা ডেস্ক’ থেকে বিনা খরচে নির্দেশনা নেওয়া যাবে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, আগস্টের শেষ সপ্তাহে একটি ‘ভিডিও টিউটোরিয়াল’ ও হটলাইন চালু করা হবে। ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে কর রেয়াতের ছাড়পত্র, অডিট বাছাইসহ সব সেবা একই প্ল্যাটফর্মে আনা হবে, ফলে এখন অনলাইনে অভ্যস্ত হওয়া করদাতাদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি হবে।

