দুঃস্বপ্নের হার পেরিয়ে এশিয়া কাপে ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশের কিশোরীরা
থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৫ এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ উইমেনস এশিয়া কাপের চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২০ নারী জাতীয় দল। শনিবার লাওসের ভিয়েনতিয়ানে বাছাইয়ের শেষ খেলায় দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ৬–১ গোলে হারলেও, পরের ম্যাচে চীনের বিপক্ষে লেবাননের পরাজয়ের কারণে সেরা তিন রানার্সআপের তালিকায় উঠে আসে পিটার জেমস বাটলারের দল। এর ফলে মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে দুইটি বয়সভিত্তিক নারী দল (অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০) এশিয়া কাপের মূল মঞ্চে গিয়ে দেশের নারী ফুটবলে নতুন মাইলফলক যোগ করল।
পটভূমি
বাছাইপর্বের ‘এইচ’ গ্রুপে স্বাগতিক লাওসকে ৩–১ এবং তিমুর লেস্তেকে ৮–০ গোলে হারিয়ে শুরুটা দারুণই করে বাংলাদেশ। গ্রুপ সেরা হতে শেষ ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ড্র করলেই চলত, কিন্তু দুইবারের চ্যাম্পিয়নদের শক্তির কাছে ৬–১ গোলের বড় পরাজয়ে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। আট গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও সেরা তিন রানার্সআপকে নিয়ে গড়ে ওঠে মূল পর্ব। বাংলাদেশকে অপেক্ষায় বসিয়ে রাখে লেবানন–চীন ম্যাচ। শেষ পর্যন্ত চীনের জয়ে সমীকরণ বাংলাদেশের পক্ষে যায়। তিন ম্যাচে দুই জয় ও এক হারে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ হলেও গোলপার্থকে সেরা তিনের একটি স্থানে উঠে আসে লাল–সবুজের প্রতিনিধিরা।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
৬ – দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের হজম করা গোল সংখ্যা।
৮ – তিমুর লেস্তের বিপক্ষে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ জয় (৮–০)।
২ – এক মাসের মধ্যে এশিয়া কাপের মূল পর্বে পৌঁছানো বয়সভিত্তিক নারী দলের সংখ্যা।
৩ – সেরা রানার্সআপদের কোটায় পাওয়া স্থান, যার একটি পেল বাংলাদেশ।
৯ – দক্ষিণ কোরিয়ার পূর্ণ পয়েন্ট।
প্রতিক্রিয়া
ম্যাচ শেষে কোচ পিটার বাটলার বলেন, 'শেষ দিনের নাটকটা ছিল দমবন্ধ করা, কিন্তু মেয়েরা তাদের আগের দুই ম্যাচে যা খেলেছে, সেটা প্রাপ্যটা নিশ্চিত করেছে।' দলের অধিনায়ক আফাইদা খাতুন টেলিফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, 'ভিয়েনতিয়ানে স্টেডিয়ামের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা সবাই লেবাননের ম্যাচটা দেখেছি। চীন জেতায় কান্না থামানো যায়নি; আনন্দের কান্না।' বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নারী উইং প্রধান মাহফুজা আক্তার কিরণ রোববার বলেন, 'অনূর্ধ্ব-১৭ এর পর অনূর্ধ্ব-২০ দলও এশিয়া কাপে—এটা প্রমাণ করে, বিনিয়োগ করলে সাফল্য পাওয়া যায়।' সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর ক্রীড়া উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদও।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ক্রীড়া বিশ্লেষক ও সাবেক নারী দল কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন মনে করেন, 'দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে বড় হার কৌশলগত শিক্ষা দিয়েছে—অভিজ্ঞ শক্তির সাথে লড়তে হলে ডিফেন্সিভ ব্লক ও ট্রানজিশনে আরও কাজ করতে হবে।' স্পোর্টস সায়েন্স বিশেষজ্ঞ ড. হুমায়ুন কবির বলেন, 'এশিয়া কাপের মূল পর্বে বারবার যাওয়া মানে খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তা বাড়া ও স্পনসর আকর্ষণের সুযোগ তৈরি হওয়া।' তিনি বাজেট বাড়িয়ে খেলোয়াড়দের পুষ্টি–বায়োমেকানিকস সাপোর্ট নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন।
এরপর কী
থাইল্যান্ডে মূল আসর বসবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে। সেখানে স্বাগতিক থাইল্যান্ডের পাশাপাশি জাপান, উত্তর কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এবং বাছাই থেকে ওঠা অন্য দলগুলোর মোকাবিলা করবে বাংলাদেশ। ফেডারেশন সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবরে জার্মানি ও মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের পরিকল্পনা রয়েছে। বাফুফে টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পাবলো লোপেজ বলেছেন, 'তরুণিরা যেন দ্রুত গতির ফুটবলে মানিয়ে নিতে পারে, সেজন্য ইউরোপীয় একাডেমিতে দুই সপ্তাহের ক্যাম্প নিয়েও কাজ চলছে। তহবিলের একটা অংশ ইতিমধ্যেই স্পোর্টস কাউন্সিল থেকে বরাদ্দ হয়েছে।' meanwhile, বাফুফে জেলা পর্যায়ে অনূর্ধ্ব-১৫ ট্যালেন্ট হান্ট চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দিয়েছে।
এর গুরুত্ব কী
২০১৮ সালে সাফ জয়ে যেখান থেকে স্বপ্নটা শুরু, সেখান থেকে বয়সভিত্তিক দুই দলের এশিয়া কাপে টানা কোয়ালিফাই দেশের নারী ফুটবলের পেলব মাটিকে আরও শক্ত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিতি খেলোয়াড়দের বাজারমূল্য বাড়াবে, পৃষ্ঠপোষক ও সম্প্রচারস্বত্ব এনে দেবে নতুন আয়। একই সঙ্গে নারীদের অংশগ্রহণের সামাজিক বার্তাও জোরালো হবে—মফস্বলের শামীমা বা সাগরিকার ফুটবল বুট এখন দেশের হাজারো মেয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছে।

