ট্রাম্পের সঙ্গে আসন্ন বৈঠকের আগে মোদি ও সি–কে ফোন করে সমর্থন চাইছেন পুতিন
ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তি আলোচনাকে সামনে রেখে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী শুক্রবার (১৫ আগস্ট) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মুখোমুখি হবেন। বৈঠকের এক সপ্তাহ আগে, গত শুক্রবার পুতিন টেলিফোনে চীনা নেতা সি চিন পিং ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও সম্ভাব্য শান্তি প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করেন। প্রথা অনুযায়ী ট্রাম্প ৮ আগস্টের মধ্যে সমাধানে অগ্রগতি না হলে রাশিয়া ও তাদের কাছ থেকে তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। ইতিমধ্যে ভারতীয় পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক বসিয়ে দিয়েছে ওয়াশিংটন। পুতিনের ফোনাকবরে দুই বৃহৎ এশীয় শক্তিই শান্তিপূর্ণ সমাধানকে স্বাগত জানালেও তারা নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ওয়াশিংটনের চাপের ভারসাম্য রক্ষায় সতর্ক।
প্রেক্ষাপট
ইউক্রেনে পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সাড়ে তিন বছর গড়ালো। রুশ বাহিনী পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখলেও পশ্চিমা অস্ত্রায়নে কিয়েভ প্রতিরোধ করছে। যুদ্ধ বন্ধে কয়েক দফা মধ্যস্থতা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি পুতিনকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত আল্টিমেটাম দেয়—সমঝোতায় না এলে রাশিয়ার জ্বালানি, ব্যাংক ও প্রতিরক্ষা খাতে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ হবে এবং মস্কোর তেল কেনা দেশগুলোকেও বিলিয়ন ডলারের শুল্ক দিতে হবে। চীন-রাশিয়া বাণিজ্য গত বছর ২১৪ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে, অন্যদিকে ভারত রাশিয়ান তেলের তৃতীয় বৃহৎ ক্রেতা। এই দুই দেশকে পাশে পেলে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চাপ সামলানো মস্কোর জন্য কিছুটা সহজ হবে।
প্রতিক্রিয়া
চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভি জানায়, সি চিন পিং ফোনে পুতিনকে বলেন যে মস্কো-ওয়াশিংটন যোগাযোগকে চীন ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এবং ‘রাজনৈতিক সমাধানে’ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি এক্সে লিখেছেন, “বন্ধু পুতিনের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে; তিনি ইউক্রেনের সাম্প্রতিক অবস্থা ব্যাখ্যা করেছেন।” ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ট্রাম্পের শুল্ক বাড়ানোর প্রসঙ্গ এড়িয়ে গেছে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, বেলারুশের আলেক্সান্দার লুকাশেঙ্কো এবং মধ্য এশিয়ার দুই প্রতিবেশী কাজাখস্তান-উজবেকিস্তানের নেতাদের সঙ্গেও গত সপ্তাহে কথা বলেছেন পুতিন, যা রাশিয়ার কূটনৈতিক সক্রিয়তারই ইঙ্গিত দেয়।
বিশ্লেষণ
মস্কোভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউরি বারিসভ ‘রয়টার্সকে’ বলেন, “পুতিন জানেন বাইডেনের চেয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত রসায়ন ভালো, তাই অল আউট কূটনীতি করছেন।” তাঁর মতে, চীন ও ভারতের সম্মতি ছাড়া রাশিয়ার তেল রপ্তানিতে ধাক্কা লাগবে, ফলে ফোন কূটনীতি মূলত জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টা। দিল্লিভিত্তিক পর্যবেক্ষক স্বাতী দীক্ষিত মনে করেন, ট্রাম্পের ট্যারিফ চাপ সত্ত্বেও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না, তবে সমানতালে মার্কিন বাজারেও প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চাইবে। বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জিয়াং লি বলেন, “চীনের জন্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া যেমন ব্যবসা বাড়াচ্ছে, তেমনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। তাই বেইজিং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী, সমাধানে নয়।” বিশ্লেষকদের যৌথ অভিমত, বৈঠকে ট্রাম্প হয়তো সীমিত যুদ্ধবিরতির রূপরেখা তুলে ধরবেন, কিন্তু মূল প্রশ্ন—রুশ সেনা প্রত্যাহার বনাম পূর্বাঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন—এখনও অমীমাংসিত।
এরপর কী
ক্রেমলিন জানিয়েছে, ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক হবে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায়, যেখানে ১৫ আগস্ট সকালে দুই নেতা মুখোমুখি বসবেন। একই স্থানে রুশ ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীদ্বয়ও পৃথক বৈঠক করবেন। হোয়াইট হাউস সূত্র সিএনএনকে বলেছে, ৮ আগস্টের ডেডলাইন পেরিয়ে গেলেও ‘যদি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়’ তবে শুল্ক ও নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সাময়িক ছাড় দেওয়া হতে পারে।Meanwhile, বাজার বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, সমঝোতা ভেস্তে গেলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি আরও ১২-১৫ ডলার বাড়তে পারে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে। ফলে জেনেভা আলোচনার দিকে নজর সবার; সারি-বাঁধা ফোন কূটনীতি শেষ পর্যন্ত শান্তির রূপরেখা এনে দেবে, না পশ্চিমা-রুশ টানাপোড়েন আরও তীব্র করবে, তা নির্ধারিত হবে চলতি সপ্তাহেই।

