জুলাই আন্দোলনে নিহত আবিরের মামলায় পুলিশের বহিষ্কারপ্রতিবেদন নিয়ে আজ শুনানি

জুলাই আন্দোলনে নিহত আবিরের মামলায় পুলিশের বহিষ্কারপ্রতিবেদন নিয়ে আজ শুনানি

ঢাকার গুলশানে গত বছরের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় গুলিতে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল আবিরের হত্যা মামলায় পুলিশের চূড়ান্ত (‘ফাইনাল’) প্রতিবেদন চ্যালেঞ্জ করে করা ‘নারাজি’ আবেদনের শুনানি রোববার, ১০ আগস্ট। অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. জিয়াদুর রহমানের আদালত এ দিন ধার্য করেছেন।
পুলিশ ২২ অক্টোবর দিয়েছে যে প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগ নেতা তানভীর আলীসহ ১০ আসামিকে অব্যাহতি সুপারিশ করা হয়; রাষ্ট্রপক্ষ বলছে, মাত্র ৬০ দিনে করা ‘মনগড়া’ তদন্তে বাদী ও সাক্ষীদের খুঁজে না পাওয়ার অজুহাত দেখানো হয়। ঢাকা জেলা ভারপ্রাপ্ত পিপি আজিজুল হক দিদারের দাখিল করা নারাজিতে পুনর্তদন্ত ও আসামিদের পুনঃঅভিযোগ গঠনের অনুরোধ রয়েছে।

পটভূমি

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর গুলশানের কালাচাঁদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রায় গুলি চালানো হয়। সংগঠক-শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল আবির ঘটনাস্থলেই মারা যান, আহত হন আরও ছয়জন। প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেন—স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ী তানভীর আলীর নির্দেশে যুবলীগ-ছাত্রলীগের একটি দল হামলা চালায়।

আবিরের বন্ধু হাসান মাহমুদ ১৮ আগস্ট ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হত্যা মামলা করেন; পরদিন গুলশান থানা এজাহার নথিভুক্ত করে। মোট ১০ নাম উল্লেখসহ ১৫০-২০০ অজ্ঞাতকে আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত ভার পান তৎকালীন উপ-পরিদর্শক (নিরস্ত্র) রোমেন মিয়া। মাত্র দুই মাসের মাথায়, ২২ অক্টোবর, তিনি আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেন—যাতে অভিযোগ ‘তথ্যগত ভুল’ আখ্যা দিয়ে সব আসামিকে বাদ দেওয়া হয়।

প্রতিক্রিয়া

ফাইনাল রিপোর্টের খবর পাবার পর নিহতের পরিবার, সহযোগী শিক্ষার্থীরা ও অধিকার সংগঠনগুলো ক্ষোভ জানায়। তাদের অভিযোগ, ‘রাজনৈতিক প্রভাব’ খাটিয়ে তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়া হয়েছে। প্রধান আসামি তানভীর আলীর বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র সত্ত্বেও তাকে ‘কানাডার নাগরিক’ দেখিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আরও অভিযোগ—ক্লোজ-সার্কিট ফুটেজ, সামাজিক গণমাধ্যমের লাইভ এবং আহতদের চিকিৎসা নথি সত্ত্বেও সেগুলো জব্দ বা বিশ্লেষণ করা হয়নি।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুল হক দিদার ১৩ জুলাই আদালতে ‘নারাজি’ দাখিল করে বলেন, ‘বাদী-সাক্ষী কাউকেই ডাকা হয়নি, তদন্তের নামে কমন রুটিন প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।’ আদালত আবেদন গ্রহণ করে ১০ আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করেন।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• নিহত: ১ (আব্দুল্লাহ আল আবির)

• আসামি: ১০ নামীয়, ১৫০-২০০ অজ্ঞাত

• তদন্তে সময়: ৬০ দিন

• আদালতে শুনানি: ১ম—১০ আগস্ট ২০২5

• পৃথক মানবতাবিরোধী অনুসন্ধান: ১ (তানভীর আলী সম্পর্কে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তদন্ত সংস্থা)

বিশ্লেষণ

আইনজ্ঞদের মতেমতে, ‘ফাইনাল রিপোর্ট’ মানে মামলার সমাপ্তি নয়—আদালত অথবা বাদী-রাষ্ট্রপক্ষ সন্তুষ্ট না হলে পুনর্তদন্ত, পুনঃবিচার কিংবা তদন্তকারী পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারেন। উচ্চ আদালতের নজির রয়েছে, যেখানে পুলিশ অব্যাহতির পরও র‍্যাব-সিআইডি নতুন করে তদন্ত করে অভিযোগপত্র দিয়েছে।

এই মামলায় মূল প্রশ্ন তিনটি: (১) গুলির উৎস—বেসামরিক নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর? (২) ঘটনা পরিকল্পিত কিনা? (৩) ডিজিটাল ও ফরেনসিক প্রমাণ লাভজনকভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে কি? পিপি দিদার দাবি করেছেন, ‘সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ তদন্তে উপেক্ষিত।’ আদালত যদি পুনর্তদন্তের আদেশ দেন, তাহলে মামলাটি সিআইডি বা পিবিআইর হাতে যেতে পারে, যা প্রচলিত প্রক্রিয়ায় আরও ছয় মাস সময় পেতে পারে।

এরপর কী

রোববার শুনানিতে আদালত চারটি পথ বেছে নিতে পারেন—

১. নারাজি আবেদন নামঞ্জুর করে পুলিশ প্রতিবেদন গ্রহণ; ফলে আসামিরা আনুষ্ঠানিকভাবে অব্যাহতি পাবেন, বাদীপক্ষ রিভিশন চাইতে পারবে।

২. নারাজি আংশিক মঞ্জুর করে কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে বাছাই তদন্তের নির্দেশ।

৩. সম্পূর্ণ নারাজি মঞ্জুর করে নতুন সংস্থাকে পুনর্তদন্তের নির্দেশ।

4. মামলাটি বিচারিক আদালতে বিচারের জন্য গ্রহণ করে সরাসরি অভিযোগ গঠন।

সমমনাভাবে, তানভীর আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ তদন্ত চলায় তিনি যদি ট্রাইব্যুনালে অভিযুক্ত হন, ওই রায় এ হত্যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করতে পারে। অধিকার সংগঠনগুলোর আহ্বান—‘আবির হত্যার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই জুলাই আন্দোলনের শহীদদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা’।

More From Author

জাবি-তে আবাসিক হলে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ছাত্রদের রাতভর বিক্ষোভ

নিউ মার্কেটের তিন দোকানে সেনা হানা, ১১০০ সামুরাই ও ধারালো অস্ত্রের জোগানচক্র ভেঙে ৯ জন আটক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *