চট্টগ্রাম বন্দরে রবি-এক্সেনটেকের ৫-জি ‘স্মার্ট পোর্ট’ চুক্তি, দক্ষতা বাড়াতে বড় পরিকল্পনা
চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় ও দ্রুততর পণ্য চিহ্নিতকরণ, ক্রেইন নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণে ৫-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার সম্ভাবনা যাচাই করবে মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটার সহযোগী প্রতিষ্ঠান এক্সেনটেক পিএলসি। রোববার (১০ আগস্ট) দুপুরে বন্দর ভবনে সিপিএ ও এক্সেনটেকের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন এবং সিপিএ চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান। এ চুক্তি অনুযায়ী, ছয় মাসের মধ্যে বন্দরে ৫-জি ভিত্তিক প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ও স্বয়ংক্রিয় চালনা ব্যবস্থার টেকনিক্যাল ও বানিজ্যিক সম্ভাব্যতা রিপোর্ট জমা পড়বে।
সরকার আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এনসিটি, লালদিয়া ও বে টার্মিনালে প্রথম অপারেটর নিয়োগ দিতে চায়; ২০৩০ সালের মধ্যে বন্দরের হ্যান্ডলিং ক্ষমতা চারগুণ বাড়ানোর লক্ষ্যও ঘোষণা করেছে বিডা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৫-জি ও আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর একসঙ্গে আসলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর পরিচালনায় ‘কোয়ান্টাম জাম্প’ ঘটবে।
প্রেক্ষাপট
বন্দর দিয়ে বছরে ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি-রপ্তানি পণ্য যাতায়াত করে। কিন্তু কনটেইনার হ্যান্ডলিং এখনও অনেকাংশে মানবনির্ভর ও ৪-জি ডেটা নেটওয়ার্কের ওপর ভরসা করে। অবকাঠামো বাড়লেও ডিজিটাল কানেক্টিভিটি ও তা থেকে প্রাপ্ত রিয়েল-টাইম ডেটার অভাব পণ্য খালাসে বিলম্ব, যানজট ও অপারেশনাল খরচ বাড়ায়। এ বছরই ড্রাইডক লিমিটেড এনসিটির অপারেটর দায়িত্ব নিয়ে এক মাসে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৩০ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রযুক্তি হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• সম্ভাব্য ৫-জি নেটওয়ার্ক কভারেজ: ৪ কিলোমিটার জেটি ও ইয়ার্ড এলাকা
• লক্ষ্যমাত্রা: প্রতি মিনিটে ১ মিলি/সেকেন্ডের কম ল্যাটেন্সি
• আইএফসি-র হিসাব: বন্দরে সর্বোচ্চ ১.৯ মিলিয়ন টিইইউ হ্যান্ডলিং সম্ভাবনা
• বর্তমান রেকর্ড (২০২৪-২৫): ১.৩ মিলিয়ন টিইইউ
• সরকারের লক্ষ্য: ২০৩০-এর মধ্যে সক্ষমতা ৪ গুণ
• সম্ভাব্য বিনিয়োগ: প্রাথমিক পর্যায়ে ২৫-৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (রবি-এক্সেনটেক অভ্যন্তরীণ অনুমান)
এর গুরুত্ব কী
৫-জি প্রাইভেট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্যান্ট্রি ক্রেইন, রাবার-টাইয়ার্ড গ্যান্ট্রি ও লজিস্টিক যান স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে, ফলে শিফট পরিবর্তনজনিত সময় নষ্ট হবে না। হাই-ডেফিনিশন ক্যামেরা ও আইওটি সেন্সর দিয়ে কনটেইনার চেক-ইন-চেক-আউট রেকর্ড হবে রিয়েল-টাইমে; সিকিউরিটি স্ক্যান দ্রুত হবে; বন্দর এলাকায় ‘স্মার্ট অ্যাকসেস কন্ট্রোল’ ম্যানেজমেন্ট বাড়বে। এতে খালাস সময় (ডুয়েল টাইম) ৪৮ ঘণ্টা থেকে ২৪ ঘণ্টার নিচে নামানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্যবসায় ব্যয় ৮-১০ শতাংশ কমাতে পারে বলে রবির অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
চুয়েটের তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল করিম বলেন, "৫-জি-র আল্ট্রা-লো ল্যাটেন্সির কারণে দূর থেকে রোবটিক ক্রেইন পরিচালনা সম্ভব। সঠিক রোডম্যাপ ও সাইবার সিকিউরিটি নিশ্চিত করলে চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার ‘রেফারেন্স পোর্ট’ হতে পারে।"
বন্দর গবেষক ক্যাপ্টেন শফিউল আজম মনে করেন, "অপারেটর ও নেটওয়ার্ক—দুটিই একসঙ্গে আপগ্রেড না করলে প্রকৃত সুবিধা পাওয়া যাবে না। ডিসেম্বরের মধ্যে অপারেটর নিয়োগ ও ৫-জি ট্রায়াল শেষ হলেই ২০২6 সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ স্মার্ট অপারেশন শুরু সম্ভব।"
পরবর্তী পদক্ষেপ
১) এক্সেনটেক আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সার্ভেয় কাজ শুরু করবে।
২) সিপিএ পৃথক একটি ‘ডিজিটাল পোর্ট টাস্কফোর্স’ গঠন করবে, যেখানে বিডা, বিটিআরসি ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা থাকবেন।
৩) সেপ্টেম্বরে পাইলট জোনে ৫-জি নেটওয়ার্ক স্থাপন করে গ্যান্ট্রি ক্রেইনে রিমোট অপারেশন ডেমো দেখানো হবে।
৪) ডিসেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক টেন্ডার শেষে বে টার্মিনাল, এনসিটি ও লালদিয়ার চর টার্মিনালের প্রথম অপারেটর ঘোষণা করবে সরকার।
৫) ২০২5-২৬ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ অটোমেশন রোল-আউট; একই সঙ্গে আইওটি-ভিত্তিক বায়ু-জল দূষণ পর্যবেক্ষণ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃহত্তর চিত্র
পতেঙ্গা থেকে বে টার্মিনাল পর্যন্ত সমুদ্রপথে বড় জাহাজ ভিড়তে শুরু করেছে, অন্যদিকে বন্দরের বাইরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর ও কর্ণফুলী টানেল খুলে দিলে কনটেইনার ট্রাফিক বহুগুণ বাড়বে। সময়মতো স্মার্ট অবকাঠামো তৈরি না হলে জাহাজ জট ও উচ্চ সারচার্জের আশঙ্কা রয়েছে। ৫-জি নেটওয়ার্ক, আধুনিক অপারেটর ও শুল্ক প্রক্রিয়ার ডিজিটাল ডেস্ক—এই তিন স্তম্ভ একত্রে চালু হলে ‘সীমাহীন অপেক্ষা’ কাটা পড়বে বলে আশাবাদী ব্যবসায়ীরা।
শেষ কথা
চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯৭৭-এর পর বড় কোনও প্রযুক্তি বিপ্লব ঘটেনি। ৫-জি পরীক্ষার মাধ্যমে সেই খরা কাটতে চলেছে। সফল হলে মংলা, পায়রা ও আঞ্চলিক নদীবন্দরগুলোকে একই ছাতার নিচে আনতে পারবে সরকার, যা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রোডম্যাপের পরিবহন-লজিস্টিক অধ্যায়ে বড় মাইলফলক যোগ করবে।

