গাজা সিটি দখলের পথে ইসরায়েল, ‘শত্রুকে কঠোর আঘাত’ হুঁশিয়ারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ শনিবার (৯ আগস্ট) ঘোষণা দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও নিষেধাজ্ঞার হুমকি সত্ত্বেও ইসরায়েল ‘শত্রুর ওপর প্রবল শক্তি’ দিয়ে এগিয়ে যাবে এবং শিগগিরই গাজা সিটি সম্পূর্ণ কব্জা করবে। রাজধানী দখলে নিতে পারলে গোটা উপত্যকার প্রায় ৮৫ শতাংশই ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। একই দিনে গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি হামলায় আরও কমপক্ষে ৩৯ জন নিহত হন, যাদের ২১ জন ত্রাণ সংগ্রহের সময় ও ১১ জন অনাহারে প্রাণ হারান। এই নিয়ে অক্টোবরের শুরু থেকে মোট মৃতের সংখ্যা ৬১ ৩৬৯ জনে পৌঁছাল।
গাজা সিটি দখলের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জার্মানি, সুইডেন, নেদারল্যান্ডস, আর্জেন্টিনা ও মালয়েশিয়ায় বিক্ষোভ হয়েছে এবং আরব লীগ রোববার জরুরি বৈঠক ডাকেছে। ইসরায়েল ১৯৬৭ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো পুরো গাজা পুনর্দখলের দ্বারপ্রান্তে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
পটভূমি
১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধে গাজা, পশ্চিম তীর ও গোলান মালভূমি দখল করার পর ২০০৫ সালে গাজা থেকে বসতি ও সেনা প্রত্যাহার করে ইসরায়েল। তবে স্থল, নৌ ও আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকে, যা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ‘ব্লকেড’ বলে আখ্যা দেয়। ফিলিস বেনিসের মতে, “২০০৫-এ সেনা সরানো হলেও দখলদারি শেষ হয়নি, কেবল তার ধরন বদলেছে।” ৭ অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েল পূর্ণ স্থল অভিযান শুরু করে এবং mittlerweile উপত্যকার প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকায় উপস্থিতি গড়ে তোলে। গাজা সিটি দখল মানে উপত্যকার কেন্দ্র ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ, যা ফিলিস্তিনিদের চলাচল ও ত্রাণ প্রবাহকে আরও জটিল করবে।
প্রতিক্রিয়া
আন্তর্জাতিক মহলে নিন্দার স্রোত অব্যাহত। ইউরোপের কয়েকটি দেশ অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার ইঙ্গিত দিলেও কাৎজ বলেন, “কেউ আমাদের সংকল্প দুর্বল করতে পারবে না।” বার্লিন, অসলো, স্টকহোম, কুয়ালালামপুরসহ বহু শহরে হাজারো মানুষ গাজা সিটি অভিযানের বিরুদ্ধে প্ল্যাকার্ড হাতে শোভাযাত্রা করেছেন। মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল অভিযানের বিরতি এবং অবরুদ্ধ অঞ্চলে অবাধ ত্রাণ দ্রুত প্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ওয়াশিংটনভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের ফিলিস বেনিস আল-জাজিরাকে বলেছেন, "এটি দখল নয়, পুনর্দখল। ইসরায়েল হয়তো আসন্ন দিনগুলোতে শহর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেবে, কিন্তু মানবিক সংকট আরও তীব্র হবে।" অপর দিকে জেরুজালেম পোস্টে সাবেক ইসরায়েলি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা গিওরা আইল্যান্ড লিখেছেন, “গাজা সিটি সামরিকভাবে ধরা চাই; না হলে হামাসের কেন্দ্র ভাঙা যাবে না।” দুই ভিন্ন মূল্যায়নই বড় মানবিক মূল্য আর দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ঝুঁকির আভাস দেয়।
এরপর কী
রোববার কায়রোতে আরব লীগের জরুরি বৈঠকে সামরিক ও কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া সমন্বয়ের চেষ্টা হবে। কূটনীতিক সূত্রগুলো বলছে, একটি যৌথ নিন্দা প্রস্তাব, যুদ্ধবিরতির দাবি এবং ত্রাণ করিডর তৈরিতে জাতিসংঘকে সম্পৃক্ত করার সুপারিশ পাস হতে পারে। ইসরায়েল meanwhile গাজা সিটির দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রবেশমুখে অতিরিক্ত ব্রিগেড মোতায়েন করছে। পর্যবেক্ষকদের ধারণা, আগামী এক-দুই সপ্তাহই হবে শহরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ‘সিদ্ধান্ত কাল’।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• ৮৫ %: গাজা সিটি দখল হলে ইসরায়েলের সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণাধীনের হার।
• ৬১ ৩৬৯: ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা (ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়)।
• ২১: শনিবার ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিহত মানুষের সংখ্যা।
• ৯৮: অনাহারে মৃত শিশুদের সর্বশেষ সংখ্যা।
• ৭৫ % → ৮৫ %: গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের প্রকল্পিত উল্লম্ফন।
• ৫ + দেশ: শনিবার একই দিনে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত প্রধান দেশগুলো—জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, আর্জেন্টিনা ও মালয়েশিয়া।
বৃহত্তর চিত্র
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণে এই অভিযান শুধু ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার টানাপড়েন, রিয়াদ-ওয়াশিংটন নিরাপত্তা চুক্তি এবং লাল সাগরের বানিজ্য পথ—সবকিছুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজা সিটি দখল সুন্নি আরব রাষ্ট্রগুলোকে আরও কঠিন রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড় করাবে, যেখানে মানবিক চাপ ও নিরাপত্তা প্রয়োজনে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
শেষ কথা
ইসরায়েল যখন গাজা সিটির শেষ দখলদারি ধাপে প্রবেশ করছে, তখন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দ্রুত বেড়ে চলেছে এবং কূটনৈতিক পরিসর আরও সংকীর্ণ হচ্ছে। যুদ্ধ এখন সামরিক সীমানা ছাপিয়ে মানবিক, রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে—যার উত্তর দেবার দায় শুধু তেল আবিব ও হামাসের নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও।

