গাজা পুরো দখলের নতুন পরিকল্পনা অনুমোদন, ‘যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে’ বলছেন নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা উপত্যকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নতুন সামরিক পরিকল্পনার পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, এতে যুদ্ধ দ্রুতই শেষ হবে। শুক্রবার (৯ আগস্ট) ইসরায়েলি মন্ত্রিসভা প্রায় ৫০ হাজার সেনা ও চার ধাপের স্থল অভিযানসহ এ পরিকল্পনা অনুমোদন করে। রবিবার জেরুজালেমে বিদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপচারিতায় নেতানিয়াহু জানান, হামাস অস্ত্র ছাড়তে রাজি না হওয়ায় ‘অবশ্যই কাজ শেষ করতে হবে’। আন্তর্জাতিক মহল—বিশেষ করে ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি মিত্র দেশ এই পদক্ষেপকে দীর্ঘ সংঘাত ও বেসামরিক প্রাণহানির ঝুঁকি বাড়াবে বলে সতর্ক করেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, ইতোমধ্যে আহত-ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিকল্পনাটি ‘আরও বিপর্যয়’ ডেকে আনবে।
পটভূমি
গত বছর অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি সেনা অভিযান ও অবরোধ জোরদার হওয়ার পর মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে এবং ১০ লক্ষাধিক মানুষ ঘর ছাড়া। তীব্র আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ত্রাণ ঢুকতে শুরু করলেও ‘নিরাপত্তা’ কারণ দেখিয়ে ইসরায়েল স্থল আগ্রাসন চালাতে থাকে। শুক্রবারের সভায় চার ধাপের নতুন পরিকল্পনা অনুমোদন পায়: (১) উত্তরের বাসিন্দাদের দক্ষিণে সরিয়ে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ তৈরি, (২) গাজা সিটির ঘেরাও ও টানেল ধ্বংস, (৩) মধ্য ও দক্ষিণ গাজা দখল, (৪) হামাস ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষবিহীন নতুন প্রশাসন দাঁড় করিয়ে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• সেনা মোতায়েন: প্রায় ৫০ হাজার
• অভিযান ধাপ: ৪
• আনুমানিক সময়সীমা: ৪-৫ মাস
• বাস্তুচ্যুতির লক্ষ্য: ১০ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি
• আন্তর্জাতিক প্রতিবাদী দেশ: অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, জার্মানিসহ ১০-এর বেশি
প্রতিক্রিয়া
জার্মানি ইতোমধ্যে ইসরায়েলে নির্দিষ্ট অস্ত্র রফতানি সাময়িক স্থগিত করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্র দফতর বিবৃতিতে ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’র আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া পরিকল্পনাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়েছে। ইসরায়েলের ভেতরেও বিরোধীদল ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, টাইমলাইন অনুযায়ী অগ্রসর হওয়া কঠিন হবে এবং বন্দী ইসরায়েলিদের মুক্তি বিলম্বিত হতে পারে। হামাস এক বিবৃতিতে বলেছে, "স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না পাওয়া পর্যন্ত অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নই ওঠে না"।
বিশ্লেষণ
আল জাজিরা ও অন্যান্য সামরিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, গাজা পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও টানেলনির্ভর যুদ্ধক্ষেত্র; অতীতের অভিজ্ঞতায় সেখানে ‘পরিষ্কার অভিযান’ অতি ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ হয়। সামরিক দিক থেকে ইসরায়েল হয়তো কৌশলগত সুবিধা পাবে, কিন্তু বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি বাড়লে আন্তর্জাতিক বৈধতা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। একইসঙ্গে ‘নতুন প্রশাসন’ দাঁড় করানোই বা কারা করবে—এ নিয়ে পরিষ্কার রোডম্যাপ নেই। ফলে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল স্থায়ী দখলদারিতেই পড়ে যেতে পারে, যা নেতানিয়াহুরই আগে ঘোষিত লক্ষ্য ‘দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দায়িত্ব’কে বৈধতা দেবে।
এরপর কী
ইসরায়েল সেনাবাহিনী (আইডিএফ) দক্ষিণ সীমান্তে অতিরিক্ত ট্যাঙ্ক ও সাঁজোয়া যান জড়ো করেছে; উপগ্রহচিত্রে তা ধরা পড়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, দ্রুতই গাজা সিটির দিকে পূর্ণমতা স্থল অভিযান শুরু হবে। যুক্তরাষ্ট্র—যুদ্ধের প্রাথমিক মদদদাতা—খোলাখুলি সমর্থন না করলেও এখনো কড়া ভাষায় বিরোধিতা করেনি। কূটনৈতিকরা বলছেন, রামদা-মধ্যস্ততাকারী মিশর ও কাতারের কাছে বন্দী বিনিময় প্রস্তাব ফের সক্রিয় করার চাপ বাড়ছে; সাফল্য মিললে অভিযানের গতি বদলাতে পারে। অন্যথায় গাজায় আরও কয়েক মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের সম্ভাবনাই বড়।
বৃহত্তর চিত্র
মধ্যপ্রাচ্যের পরাশক্তি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টি এখন গাজার দিকে; লেবাননের হিজবুল্লাহ সীমান্তে ছোটখাটো হামলা বাড়িয়েছে। ফলে বিরোধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। একইসঙ্গে মার্কিন নির্বাচন সামনে রেখে ওয়াশিংটনের নীতিও দ্রুত বদলাতে পারে, যা নেতানিয়াহুর সরকারকে প্রতিকূল অবস্থায় ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ৭৫ বছর ধরে চলা দখল-বিরোধ শেষ করতে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ছাড়া অন্য কোনও টেকসই ফর্মুলা নেই—কিন্তু বর্তমান পরিকল্পনা সেই পথ আরও কঠিন করে তুলছে।

