গাইবান্ধায় বাবাকে ‘বিষপান করিয়ে’ হত্যা, মূল আসামিরা অধরা
৩১ জুলাই রাতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে আশেক আলী (৫২) নামের এক কৃষকের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। পুলিশ ময়নাতদন্তের আগে ধারণা করে নিয়েছে তিনি বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন। নিহতের ছেলে আলামিন মিয়া অভিযোগ করেন, তৃতীয় স্ত্রী আল্পনা আক্তার ও তার পরিবারের সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে আশেক আলীকে ডেকে নিয়ে বিষপান করিয়ে হত্যা করেন এবং লাশ বাড়ির গেটের সামনে ফেলে রাখেন। ১০ আগস্ট দুপুরে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার সুনামি মার্কেটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আলামিন সংশ্লিষ্ট সবার দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। পুলিশ ইতিমধ্যে স্ত্রী আল্পনাকে গ্রেফতার করলেও বাকি সন্দেহভাজন—শ্বশুর-শাশুড়ি ও আত্মীয় ছাদেক আলী—এখনও মুক্ত। এলাকায় এ ঘটনাকে ঘিরে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, তদন্ত চলছে এবং দ্রুত অগ্রগতি হবে।
পটভূমি
নিখোঁজ ও অকাল মৃত্যু—দুটি ঘটনা মিলে আশেক আলীর শেষ জীবনকে রহস্যময় করে তোলে। প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করলেও তা টেকেনি। ২০২৪ সালে দহবন্দ ইউনিয়নের পশ্চিম ঝিনিয়া গ্রামের আল্পনা আক্তারকে বিয়ে করেন। কিছুদিন শান্তিপূর্ণ দাম্পত্যের পর আল্পনার সঙ্গে অন্য পুরুষের সম্পর্ক ও ‘অশালীন জীবনযাপনে’ বিরক্ত হয়ে আশেক আলী বাধা দেন। দাবি অনুযায়ী, আল্পনাকে ‘মদত’ দেয় তার মা শহিতন বেগম, বাবা মতিয়ার রহমান ও আত্মীয় ছাদেক আলী। এক পর্যায়ে আল্পনা স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এক লাখ টাকা নিয়ে যান।
ঘটনাপ্রবাহ
স্ত্রী ফেরাতে ব্যর্থ হয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি আশেক আলী গাইবান্ধা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে কাবিননামার ভিত্তিতে উদ্ধার আবেদন করেন এবং আল্পনা ও তার পরিবারের তিন সদস্যকে আসামি করেন। মামলার পর ‘কৌশলে’ তাঁকে মামলা প্রত্যাহার করতে চাপ দেওয়া হয়; রাজি না হওয়ায় হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু হয় বলে পরিবারের দাবি। ৩১ জুলাই রাতে আল্পনা বাবা-মায়ের বাড়িতে আশেক আলীকে ডেকে নেন, সেখানে আরও ৩–৪ জন ছিল। অভিযোগ অনুযায়ী তারা আশেক আলীকে জোরপূর্বক বিষপান করিয়ে অচেতন অবস্থায় বাড়ির গেটের সামনে ফেলে রেখে যায়। ১ আগস্ট সকালেই সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে।
প্রতিক্রিয়া
লাশ উদ্ধারের দিনই পুলিশ আল্পনা আক্তারকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠায়, তবে অন্য অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে। সংবাদ সম্মেলনে আশেক আলীর ছেলে আলামিন বলেন, ‘একজনকে ধরে মূল চক্রকে ছেড়ে দিলে হত্যা মামলা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।’ স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী রবিউল ইসলাম মনে করেন, ‘গৃহবিবাদের মামলাগুলোতে নারীর পরিবারকে দ্রুত গ্রেফতার না করার প্রবণতা’ হয়রানি এড়াতে হলেও এখানে উল্টো প্রভাব পড়ছে। সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলেই ৩০২ ধারা যোগ হবে। বাকি আসামিদের নজরে রাখা হয়েছে, প্রয়োজনে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’
এরপর কী
পুলিশের তদন্তে বিষপ্রয়োগের প্রমাণ মিললে অভিযোগপত্রে ৩০২ ও ২০১ ধারা যুক্ত হতে পারে। জেলা পুলিশ সূত্র জানায়, ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য লিভার ও পাকস্থলীর নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে; ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়ার কথা। প্রতিবেদন পক্ষে গেলে আল্পনা ও তার স্বজনদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। meanwhile, আলামিন মিয়া আইনি সহায়তার জন্য লিগ্যাল এইড ফাউন্ডেশনের দ্বারস্থ হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন ‘অভিযান’ ইতিমধ্যে এ ঘটনাকে ‘ঘরে ঘরে বেড়ে ওঠা পারিবারিক সহিংসতার মারাত্মক উদাহরণ’ আখ্যা দিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তরের দাবি তুলেছে।

