ক্ষমতায় গেলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় জিডিপির ১০% ব্যয়সহ এক কোটি চাকরির অঙ্গীকার বিএনপির
রাজধানীর গুলশানে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সংলাপে রবিবার বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দেন, জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলে তার দল স্বাস্থ্যখাতে জিডিপির ৫% এবং শিক্ষাখাতে আরও ৫% বরাদ্দ দেবে। একই সঙ্গে সরকার গঠনের প্রথম ১৮ মাসে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ খাতে সিরিয়াস ডি-রেগুলেশন না হলে বিনিয়োগ বাড়বে না’, তাই লাইসেন্স–অনুমোদনের জটিলতা কমাতে প্রশাসনিক সংস্কারের কথাও ভাবছে বিএনপি। বক্তব্যের সময় তিনি রাজনৈতিক সহনশীলতার আহ্বান জানান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে ‘কখনোই’ নির্বাচনের পরিবেশ পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি বলে মত দেন।
মূল তথ্য
সিপিডির ‘অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর’ শীর্ষক সংলাপে সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু বক্তৃতা করতে গিয়ে কয়েকটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য তুলে ধরেন। ১) স্বাস্থ্যখাতে বর্তমান ১.৩% থেকে ৫% জিডিপি বরাদ্দ, ২) শিক্ষাখাতে বর্তমান প্রায় ২%-এর জায়গায় ৫% বরাদ্দ, ৩) প্রথম ১৮ মাসেই এক কোটি নতুন চাকরি, ৪) বিনিয়োগ উৎসাহে ‘সিরিয়াস ডি-রেগুলেশন’—তার উদাহরণ, একটি রেস্তোরাঁ খোলার জন্য এখন ১৯টি অনুমতি লাগে যা কমিয়ে আনা হবে। খসরু দাবি করেন, এই সংস্কারগুলো হলে ‘অর্থনীতি সঠিক পথে ফিরবে’ এবং বিদেশি ও দেশীয় উদ্যোক্তারা আগ্রহ পাবেন।
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বরাদ্দ দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার সর্বনিম্নদের মধ্যে। অর্থবছর ২০২৫–২৬ এর বাজেটে স্বাস্থ্যখাতে সরকারি ব্যয় মোট বাজেটের ৫.৩% (জিডিপির মাত্র ১.৩%) আর শিক্ষাখাতে ১০.৮% (জিডিপির প্রায় ২%)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউনেসকো দুই খাতেই জিডিপির ন্যূনতম ৫% ব্যয় করার সুপারিশ করে আসছে। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও অন্যান্য দল জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দিচ্ছে। গত মাসে আওয়ামী লীগ নেতারা ‘স্বাস্থ্য বীমা ও দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল’ ঘোষণার ইঙ্গিত দেন। বিএনপি তার পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার এখনও প্রকাশ করেনি, তবে রুপরেখা হিসেবে এই আর্থ–সামাজিক অঙ্গীকার সামনে আনল।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সংলাপে উপস্থিত সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মন্তব্য করেন, ‘স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যয়ে পাঁচ শতাংশের টার্গেট আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তবে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস বলেন, এক কোটি চাকরির লক্ষ্য অর্জন করা কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব নয়, যদি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অনুমোদন–কর–সুবিধা একযোগে সরল করা যায়। তিনি সতর্ক করেন, অতিরিক্ত ব্যয় অর্থায়নে রাজস্ব সংগ্রহ ও ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিক্রিয়া
আওয়ামী লীগ দফতর সম্পাদক সায়েম খান রোববার রাতে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিএনপির অতীত শাসনামলে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অবস্থা কী ছিল, তা মানুষ ভুলে যায়নি—এ ধরনের অস্বাভাবিক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারকে বিভ্রান্ত করা যাবে না।’ তবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডি-রেগুলেশন এবং অনুমোদন কমানোর কথা সব দলই বলে আসে; যদি কেউ বাস্তবে তা করে দেখায়, অর্থনীতি উপকৃত হবে।’ সামাজিক মাধ্যমে বিএনপি সমর্থকেরা সিদ্ধান্তকে ‘গেম চেঞ্জার’ বললেও সংশয়বাদীরা অর্থায়নের সূত্র স্পষ্ট না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন।
এরপর কী
নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ ভোটের আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণার আগেই প্রধান দলগুলোর ইশতেহার প্রকাশ চান সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, আগামী দুই মাসের ভেতর পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক রোডম্যাপ আনবেন। তাতে কর কাঠামো সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগের বিস্তারিত থাকবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, স্বাস্থ্য–শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর জোর দিয়ে বিএনপি তরুণ ভোট ব্যাংককে টার্গেট করছে। শেষ পর্যন্ত টার্গেটগুলো কতটা বাস্তবসম্মত পরিকল্পনায় রূপ পায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

