কুলাউড়ায় ফেসবুক ভিডিওর কারণে ১৬ বছরের কিশোর গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক

কুলাউড়ায় ফেসবুক ভিডিওর কারণে ১৬ বছরের কিশোর গ্রেপ্তার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌর শহরের ভাঙারিপট্টি এলাকায় শনিবার (২৮ অক্টোবর) রাতে পুলিশের অভিযানে নবম শ্রেণির ছাত্র ফাহিম ইসলাম (১৬)-কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ৪৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেন এবং শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে মন্তব্য করেন। পুলিশ জানায়, ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পরই তাকে আটক করা হয় এবং জুলাইয়ের গণ-আন্দোলন ঘিরে আগের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, যেখানে তার বয়স ১৯ বছর উল্লেখ ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, ফাহিম ‘রাজনৈতিক উসকানি’ দিয়েছেন। পরিবার বলছে, ছেলেটি পরিস্থিতি না বুঝে ভিডিওটি বানিয়েছে। এ ঘটনায় কিশোরের গ্রেপ্তার আইনগতভাবে কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পটভূমি

কুলাউড়ার ভাড়াবাড়িতে বসবাসকারী ফাহিমের বাবা একটি সাজসজ্জা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন, মা গৃহকর্মী। ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছিল ওই বাসার মালিকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে। পেছনের দেওয়ালে বঙ্গবন্ধু সরকারবিরোধী বক্তব্যের জন্য একসময় পরিচিত বিএনপি নেতা মৃৎস্য সাইফুর রহমানের ছবিও টাঙানো ছিল। ৪৭ সেকেন্ডের ক্লিপে স্কুলছাত্রটি নিজেকে ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ দাবি করে আওয়ামী লীগের ‘ফেরার’ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, ২০২4 সালের ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’-এর পর থেকেই দেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে এবং দলটির সমর্থকদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলছে।

প্রতিক্রিয়া

গ্রেপ্তারের খবর ছড়াতেই স্থানীয় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, কিশোর আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচের কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে বিশেষ শিশু আদালতে সোপর্দ করা ও সংশোধনীমুখী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, কিন্তু পুলিশের মামলায় ফাহিমের বয়স ১৯ দেখানো হয়েছে। কুলাউড়া থানার উপপরিদর্শক হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, “সে জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, কারও প্ররোচনায় নয়, নিজে থেকেই ভিডিও করেছে।’’ অন্যদিকে, কিশোরের মা জানান, ‘‘ছেলেটি রাজনীতির কিছুই বোঝে না, মজা করে ভিডিও করেছিল।’’ বিএনপির স্থানীয় নেতারা ঘটনাটিকে “অতিরিক্ত পুলিশি তৎপরতা” বলে সমালোচনা করেছেন, তবে আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ হওয়া শাখাগুলো এখনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

বিশ্লেষণ

বাংলাদেশের প্রচলিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন থেকে শুরু করে জননিরাপত্তা আইন—সব আইনে রাষ্ট্রবিরোধী বা নিষিদ্ধ সংগঠনের পক্ষে প্রচার প্রচারণাকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশ করলেই ‘শিশু আইন ২০১৩’ অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ককে বহুবর্ষের মামলায় জড়ানো কতটা সংবিধানসম্মত, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দ্বিধান্বিত। আইনজীবী মাঁজহারুল ইসলাম বলেন, “একদিকে সরকার কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ‘সংশোধনমূলক নীতিমালা’ চালু করে, অন্যদিকে রাজনৈতিক ভিডিওর জন্যই যদি একজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে সেটি সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।” সামাজিক নেটওয়ার্কে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিধি ও সীমা নিয়ে বহুবছর ধরেই বিতর্ক চলমান; ফাহিম-ঘটনা সেই আলোচনাকে নতুন করে তীব্র করেছে।

এর গুরুত্ব কী

ঘটনাটি একদিকে কিশোর অপরাধ ও অনলাইনে রাজনৈতিক অভিব্যক্তির জটিল সঞ্চালনকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে রাজনৈতিকভাবে ‘বিরুদ্ধ’ বা ‘নিষিদ্ধ’ মতকে প্রশ্রয় না দেওয়ার বর্তমান সরকারি কৌশলকেও স্পষ্ট করেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় সার্বক্ষণিক নজরদারি এখন এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে, যেখানে সাধারণ কিশোর-কিশোরীও আক্রমণাত্মক আইনগত পর্যবেক্ষণের আওতায় পড়ছে। এর ফলে আত্মপ্রকাশের পরিধি সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি তরুণ-সমাজ বাড়তি আতঙ্কে ভুগতে পারে।

পরবর্তী পদক্ষেপ

পুলিশ জানিয়েছে, ফাহিমকে মৌলভীবাজারের আদালতে হাজির করা হবে। আদালত চাইলে তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠাতে পারে, অথবা জামিনে মুক্তি দিতে পারে। meanwhile, মানবাধিকার সংগঠনগুলো দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি তুলেছে এবং বলেছে, বয়স নির্ধারণে বিভ্রান্তি থাকলে মেডিকেল বোর্ড গঠন করা উচিত। আইনজীবীরা পরামর্শ দিচ্ছেন, পরিবারের পক্ষে হাইকোর্টে রিট আবেদন করে মাসুমের (শিশু) হিসেবে বিচার দাবি করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। মামলা একটি নজির হয়ে বাংলাদেশের অনলাইন রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্দেশ করবে কিনা, তা নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী আইনি লড়াইয়ের উপর।

More From Author

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টে তিন পদে সরকারি নিয়োগ, আবেদন ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত

ট্যামি ব্রুসকে জাতিসংঘে মার্কিন উপপ্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করলেন ট্রাম্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *