কলকাতায় গোপন কার্যালয় খুলে বিদেশ থেকেই দল চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ

কলকাতায় গোপন কার্যালয় খুলে বিদেশ থেকেই দল চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রথমবারের মতো ভারতে ‘গোপন’ পার্টি অফিস চালু করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি জনকণ্ঠ ও নয়া দিগন্তের খবরে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার আন্দোলনে পদচ্যুতির পর শেখ হাসিনা দিল্লি ও প্রায় একশ’ শীর্ষ নেতা কলকাতা–সংলগ্ন এলাকায় আশ্রয় নেন। সম্প্রতি শহরের এক বহুতল বাণিজ্যিক ভবনের অষ্টম তলায় সাইনবোর্ডবিহীন ছোট কার্যালয় ভাড়া নেওয়া হয়েছে, যেখানে একসঙ্গে ৩০–৩৫ জন বৈঠক করতে পারেন। বড় সভা হয় ভাড়া করা রেস্তোরাঁ বা ব্যাঙ্কোয়েটে। অর্থ আসছে বিদেশে থাকা নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের কাছ থেকে। কার্যক্রম সমন্বয় হচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও অনলাইন লাইভের মাধ্যমে; শেখ হাসিনা নিজের উপস্থিতিও জানান দিচ্ছেন ভিডিও কলে। খবরটি প্রকাশ্যে আসায় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—বিদেশে বসা নেতৃত্ব কতটা বৈধ ও কার্যকর, আর ভারত নিয়ম মেনেই কি এই তৎপরতা অনুমোদন করেছে?

পটভূমি

আওয়ামী লীগ টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে ব্যাপক ছাত্র–জনতা আন্দোলনে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ৫ আগস্ট ভোরে সেনাবাহিনীর মধ্যস্থতায় শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। একই মাসে মন্ত্রিসভার সদস্য, এমপি এবং অঙ্গসংগঠনের একাধিক নেতা দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের মামলার মুখে ভারত ও অন্যান্য দেশে চলে যান। কলকাতা, বেঙ্গালুরু ও নয়াদিল্লিতে বসবাস শুরু করা নেতা-কর্মীরা তখন বাসাবাড়ি বা হোটেলে ক্ষুদ্র বৈঠক চালাতেন। বছর পেরোতেই তারা একটি ‘স্থায়ী’ কেন্দ্রের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, যাতে সাংগঠনিক ফাইল, ডিভাইস ও গোপন বৈঠকের সুবিধা থাকে।

ঘটনাপ্রবাহ

বিবিসি বাংলার অনুসন্ধান অনুযায়ী, কলকাতার শিয়ালদহের কাছাকাছি একটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সের ৮-তলায় ৫০০–৬০০ বর্গফুটের কক্ষ ভাড়া নেওয়া হয়েছে। বাইরে নেই কোনো সাইনবোর্ড, ভেতরে নেই বঙ্গবন্ধু বা আওয়ামী লীগের লোগো; আগের ভাড়াটিয়ার চেয়ার–টেবিলই ব্যবহার করা হচ্ছে। দিনে সর্বোচ্চ ৩০–৩৫ জন নেতা সেখানে মিলিত হন। কলকাতা-সংলগ্ন সল্ট লেক ও নিউটাউন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা নেতা-কর্মীরা সে বৈঠকে যোগ দেন, বাকিরা যুক্ত হন ভার্চুয়ালে। শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে, আর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শীর্ষরা শহরতলি থেকে অনলাইন খোলা সভা পরিচালনা করেন। অতিরিক্ত সদস্য এলে নিকটবর্তী একটি চাইনিজ রেস্তোরাঁ বা ব্যাঙ্কোয়েট হল ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয়।

প্রতিক্রিয়া

দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিবিসিকে বলেন, “৫ আগস্টের বিপর্যয়ের পর বিশ্বজুড়ে থাকা কর্মীরাই অর্থ ও লজিস্টিক সহযোগিতা করছেন।” তবে দেশের ভেতরে থাকা তৃণমূল কর্মীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন—“আমরা গ্রামে হামলার শিকার, নেতারা বিদেশে সুরক্ষিত কেন?” অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মুখপাত্র এক লিখিত বিবৃতিতে বলেছেন, “বিদেশে বসে গোপন রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো বাংলাদেশের আইনে বেআইনি নয়, তবে ভারতীয় আইন মেনেও চলে কি না, সেটি দিল্লির বিষয়।” পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও সূত্রগুলো জানায়, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘নীরব সম্মতি’ ছাড়া এমন অফিস চালানো সম্ভব নয়।

বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রাশিদুল ইসলাম ঘটনাটিকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে তুলনা করতে অনিচ্ছুক। তার ভাষায়, “মুজিবনগর ছিল যুদ্ধরত দেশের স্বীকৃত সরকার; বর্তমান আওয়ামী লীগ আইনত ক্ষমতাচ্যুত একটি দল। বিদেশে থেকেও ভার্চুয়াল নেতৃত্ব এখন সম্মানিত হলেও মাঠের কর্মকৌশল, তহবিল স্বচ্ছতা ও নৈতিক দায় প্রশ্নবিদ্ধ।” আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অশোক সাহা মনে করেন, “ভারতের জন্য এটি দ্বিধাবিভক্ত কূটনীতি—একদিকে ঢাকার অন্তর্বর্তী প্রশাসনের সঙ্গে কাজ, অন্যদিকে পুরোনো মিত্র শেখ হাসিনাকে ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা।”

এরপর কী

দলের নেতারা জানিয়েছেন, কলকাতা অফিসে শিগগিরই একটি ‘মিডিয়া সেল’ ও আইনি সহায়তা ডেস্ক স্থাপন করা হবে, যাতে দেশের নেতাকর্মীরা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মামলা মোকাবিলার দিকনির্দেশনা পেতে পারেন। তহবিলের অংশ দিয়ে আগামী মাসে দিল্লি, বেঙ্গালুরু ও লন্ডনে ছোট আকারে এমন আরও দুইটি সমন্বয়কেন্দ্র খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে ভারত সরকারের কোনও লিখিত অনুমতি না থাকায় ভবিষ্যতে স্থান পরিবর্তন বা কার্যক্রম গোপন রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, বলছেন পর্যবেক্ষকরা। একই সঙ্গে তৃণমূলের ‘দূরত্ব বোধ’ কমিয়ে দেশমুখী সাংগঠনিক পুনর্গঠনের চাপও বাড়ছে।

More From Author

জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে সিপিবি-এনসিপি বিতর্ক : ‘ইতিহাস বিকৃতি’ বনাম ‘নতুন বাস্তবতা’

পূর্বাচলে ১০ কোটি টাকায় বায়োমেকানিকস ল্যাব গড়ছে বিসিবি, চোট কমাতে মিলবে আধুনিক সহায়তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *