কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনে ৯ বালুমহালের ইজারা স্থগিত, তিন মাসে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব দিতে নির্দেশ
রবিবার (১১ আগস্ট) হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ কক্সবাজার জেলার সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর এবং আশপাশে থাকা ৯টি বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছে। আদালত প্রধান বন সংরক্ষক, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উত্তর-দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ওই মহালগুলো থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখতে বলেছেন। একইসঙ্গে ৯টি মহাল কীভাবে নীতিমালা লঙ্ঘন করে তালিকাভুক্ত হলো তা ব্যাখ্যা করতে এবং বালু উত্তোলনে বনের যে ক্ষতি হয়েছে তার আর্থিক-околজিক মূল্য নির্ধারণ করে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদেশটি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) দায়ের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে দেওয়া হয়।
পটভূমি
কক্সবাজার জেলার বিস্তীর্ণ উপকূল ও পাহাড়ি এলাকায় ২০১৯ সালের বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ও ২০১৩ সালের বন আইন অনুসরণ করে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার কথা। অভিযোগ, স্থানীয় প্রশাসন ২০২3-২৪ আয়ের বছরের জন্য যেসব মহাল নিলামে তুলেছে, তার মধ্যে ৯টি রামু, উখিয়া ও চকরিয়া উপজেলার সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরেই পড়ে। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলছে, এসব এলাকায় ট্রাক ও ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনে হাতি চলার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, পাহাড়ি মাটি ধসছে ও নদী-খাল ভরাট হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে বেলা গত জুনে হাইকোর্টে রিট করলে ১১ আগস্ট আদালত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেয়।
এর গুরুত্ব কী
কক্সবাজার জেলার বনাঞ্চল শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলই নয়, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) হিসেবেও ঘোষিত। এখানে যেকোনো খনন বা বানিজ্যিক কার্যক্রমের আগে পরিবেশ ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক। বালু উত্তোলনের ফলে ২০১৮-২২ সালে এ অঞ্চলে ১,৫০০ হেক্টরের বেশি বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বন বিভাগের প্রাথমিক হিসাব। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, হিমছড়ি ও ইনানীর দুই পাশের পাহাড় নরম হওয়ায় অতিরিক্ত খনন বড় ধরনের ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ায়, যা পর্যটন অবকাঠামো ও স্থানীয় গ্রামগুলোকে সরাসরি হুমকিতে ফেলতে পারে।
প্রতিক্রিয়া
বনের ভেতর বালুমহাল বাতিলে আদালতের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে বেলা, টিএইচসি, ইয়ুথনেট-ফর-ক্লাইমেট-জাস্টিসসহ অন্তত ১৫টি পরিবেশবাদী সংগঠন। অপরদিকে কয়েকজন ইজারাগ্রহীতা রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে দাবি করেছেন, ‘আইনি প্রক্রিয়া মেনে’ তাঁরা ইজারা নিয়েছেন এবং স্থগিতাদেশের ফলে সরকারের রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি এলাকায় নির্মাণসামগ্রীর দাম বাড়বে। জেলা প্রশাসক (ভারপ্রাপ্ত) শাহীন রেজা সাংবাদিকদের জানান, “আদালতের নির্দেশ হাতে পেলেই আমরা কার্যক্রম বন্ধ করে দেব।” পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না দিলেও একটি উচ্চপদস্থ সূত্র জানায়, তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ড. আনোয়ারুল কাদির, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, বলেন, “বালুমহাল যতই লাভজনক হোক, বন আইনের ২৬(১) ধারা অনুযায়ী সংরক্ষিত বনে বাণিজ্যিক খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। হাইকোর্টের আদেশ আইনের সঙ্গেই সঙ্গতিপূর্ণ।” সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (বন) ইবনে হোসেনের মতে, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় বন বিভাগকে পাশ কাটিয়ে জেলা প্রশাসন একক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা ‘প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতির’ উদাহরণ। পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞ সুনন্দ বিজয় বলেন, “রুল জারির অর্থ, আদালত সরকারের কাছ থেকে ব্যাখ্যা চাইছে—এটাই গণতান্ত্রিক ও আইনি জবাবদিহিতার সঠিক পথ।”
পরবর্তী পদক্ষেপ
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে:
1) অবিলম্বে সবধরনের বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে।
2) তিন মাসে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব, দায়ী ব্যক্তিদের তালিকা ও পুনর্বনায়নের সুপারিশসহ প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করতে হবে।
3) চূড়ান্ত শুনানিতে আদালত ইজারা বাতিল ও ক্ষতিপূরণ আদায়ের নির্দেশ দিতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তর ইতিমধ্যে যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে বন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রতিনিধি থাকবেন। আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড় ও নদী তীরে জরুরি প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু করার তাগিদ দেন কর্মকর্তারা।
বৃহত্তর চিত্র
সারা দেশে ১,২০০টির বেশি বালুমহাল রয়েছে, যার ৩০ শতাংশই নদী ও বনাঞ্চলের দখলে পড়ে। ২০২2-২৩ অর্থবছরে এসব মহাল থেকে সরকার ১,৯৪০ কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে, কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, একই সময়ে ভূমিধস, নদী ভাঙন ও বনক্ষতির আর্থিক ক্ষতি দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৩,৫০০ কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই খনন নীতি না থাকলে রাজস্বের থেকে দ্বিগুণ সামাজিক-পরিবেশগত ক্ষতি গুণতে হবে। কক্সবাজারের রায়টি তাই একটি নজির, যা অন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর ইজারা ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আনতে পারে।
শেষ কথা
হাইকোর্টের এই আদেশ শুধু নয়টি বালুমহাল স্থগিতের বিষয় নয়; এটি পরিবেশ আইনের শাসন, সরকারের নীতি সামঞ্জস্য এবং স্থানীয় জনস্বার্থের পরীক্ষাও বটে। আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশনা ও সরকারি সংস্থার বাস্তবায়ন আপাতত অপেক্ষমাণ, তবে কক্সবাজারের সংরক্ষিত বন আপাতত একটি বড় ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পেল—এটাই এলাকাবাসী ও পরিবেশকর্মীদের তাত্ক্ষণিক স্বস্তি।

