এক বছরে শিক্ষায় স্থবিরতা: কমিশন গড়া না, বাজেটও বাড়েনি
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বড় ধরনের নীতি বা কাঠামোগত সংস্কার দেখা যায়নি। প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বেশির ভাগ পদে ব্যক্তি বদল হলেও সিদ্ধান্তহীনতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও বাজেট ঘাটতি রয়ে গেছে বলে প্রথom Alo-র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। চলতি অর্থবছরে মোট বাজেটে শিক্ষার অংশ আগের মতোই নিম্নমুখী, প্রাথমিক স্তরে বরাদ্দ আবার কমেছে। জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতিও আলোর মুখ দেখেনি, ফলে মান-উন্নয়ন, নতুন পাঠক্রম ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই ঝুলে আছে।
পটভূমি
গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে শুরুতে শিক্ষার দায়িত্ব ছিল প্রধান উপদেষ্টার অধীনে। পরে দায়িত্ব যান অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের কাছে, এখন আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সি আর আবরার। জুলাই অভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে সবাই বড় ধরনের শিক্ষা সংস্কার আশা করলেও বছর ঘুরে দেখা যাচ্ছে, ইঙ্গিতমাত্রই রয়ে গেছে।
মূল তথ্য
• বাজেট: চলতি ২০২4-২৫ অর্থবছরে মোট বাজেটে শিক্ষার হার বাড়েনি; প্রাথমিক শিক্ষায় বরাদ্দ কমেছে।
• কমিশন: রাষ্ট্র সংস্কারে ১১টি কমিশন হলেও শিক্ষা নিয়ে কোনো কমিশন গড়া হয়নি।
• পাঠক্রম: বিতর্কিত নতুন কারিকুলাম বাতিল করে ২০১২ সালের কারিকুলামে ফিরে গেলেও এনসিটিবি মার্চ থেকে চেয়ারম্যানশূন্য।
• বৃত্তি পরীক্ষা: প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণিতে কোটা-ভিত্তিক বৃত্তি পরীক্ষা পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ মতামত উপেক্ষা করেছে।
• বিশ্ববিদ্যালয়: জুলাই পরবর্তী পদত্যাগের ঢল সামাল দিতে উপাচার্য নিয়োগের ‘সার্চ কমিটি’ সক্রিয় হলেও অধিকাংশ ক্যাম্পাসে কয়েক মাস প্রশাসনিক অচলাবস্থা ছিল।
প্রতিক্রিয়া
সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় কোটা রাখাকে ‘বৈষম্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ বলে মন্তব্য করেছেন। শিক্ষাবিদ মনজুর আহমেদের ভাষায়, “আমরা আশাভঙ্গের বছর পার করেছি।” অন্যদিকে বর্তমান শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার প্রথম আলোকে বলেন, “কিছু উদ্যোগ নিয়েছি, আগামী পাঁচ–ছয় মাসে গতি আসবে।” তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা ঢেলে সাজাতে কাজ শুরু হওয়ার তথ্য দিলেও শিক্ষা কমিশন না হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী কাজী মাহবুবুর রহমান মনে করেন, “প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া ব্যক্তিবদল কোনো ফল দেবে না।” নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক তৌফিকুল ইসলাম মিথিল বলেন, “কমিশন ছাড়া কারিকুলাম, নিয়োগ ও অর্থ বরাদ্দ—সব ক্ষেত্রেই স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্ত চলবে, যা শিক্ষার মান ধীরগতির করবে।” টিভি৯ বাংলা প্রকাশিত সাম্প্রতিক আর্থিক কেলেঙ্কারির উদাহরণ টেনে কেউ কেউ বলেন, শিক্ষা খাতে নজরদারি দুর্বল থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও অব্যবস্থাপনা বাড়ে।
এর গুরুত্ব কী
শিক্ষা খাতে দীর্ঘস্থায়ী অবহেলা শুধু মানহীন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে না, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নকেও শ্লথ করে। বাজেট ও নীতি স্থবির থাকলে জাতীয় মানবসম্পদ পরিকল্পনা বিঘ্নিত হয়, যা প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই শিক্ষা কমিশন গড়া ও অর্থায়ন বাড়ানো এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য জরুরি অগ্রাধিকার।
পরবর্তী পদক্ষেপ
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ১২৩টি পাঠ্যপুস্তক পুনর্মূল্যায়নের কাজ এগোচ্ছে এবং ২০২৭ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য ‘পরিমার্জিত’ কারিকুলাম পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরিকল্পনা আছে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বোনাস ২৫ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত হলেও অবসর-কল্যাণ ট্রাস্টের ২,২০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড় হতে আরও ছয় মাস লাগতে পারে। পর্যবেক্ষকদের পরামর্শ—আগামী অর্থবছরের বাজেট আলাপ শুরু হওয়ার আগেই শিক্ষা কমিশন গড়ে রূপরেখা ঠিক করতে হবে; নচেৎ দ্বিতীয় বছরেরও পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাবে না।
শেষ কথা
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যাদের কণ্ঠে “বৈষম্যের অবসান” স্লোগান শোনা গিয়েছিল, তাঁদেরই বড় অংশ এখন আবার বই, বৃত্তি ও সুশাসনের জন্য আন্দোলনে নেমেছে। তাই শিক্ষা নিয়ে দ্রুত, সুস্পষ্ট ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত না নিলে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার-সুনাম পুরোপুরি প্রশ্নের মুখে পড়ার ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে।

