উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’: মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কঠোর বার্তা
শনিবার (৯ আগস্ট) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার-সম্বন্ধে সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এ.বি.এম. আবদুস সাত্তারের সাম্প্রতিক অভিযোগ “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন”। সাত্তার কয়েকজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির ইঙ্গিত দিলেও কারো নাম, সময় বা আর্থিক পরিমাণ উল্লেখ করেননি। সচিব বলেন, প্রমাণ ছাড়া এমন অভিযোগ জনআস্থা ক্ষুণ্ণ করে এবং প্রশাসনের স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ করে। তিনি সাত্তারকে যথাযথ কাগজপত্রসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে যেতে আহ্বান জানান। সরকার সুশাসন ও জবাবদিহিতায় অটল রয়েছে বলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দাবি করেন।
প্রেক্ষাপট
গত সপ্তাহে ঢাকায় কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব এ.বি.এম. আবদুস সাত্তার দাবি করেন, ‘কয়েকজন বর্তমান উপদেষ্টা অতীতের সুবিধা আদায়ে সক্রিয় আছেন’—তবে তিনি কারও নাম প্রকাশ করেননি। নিবন্ধ ছড়িয়ে পড়লে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। সাময়িক সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ২০২4 সালের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে গঠিত, যার মূল দায়িত্ব নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। ওই প্রক্রিয়ায় কোন মহলের স্বার্থ রক্ষায় অনৈতিক লেনদেন হচ্ছে—সাত্তারের এমন ইঙ্গিতে রাজনৈতিক অঙ্গন তোলপাড় হলেও কোনো Supporting Document সামনে আসেনি।
প্রতিক্রিয়া
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো ভিডিও বার্তায় ড. শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, “জনগণের চোখে ধূম্রজাল তৈরির উদ্দেশ্যে এমন অভিযোগ ছোড়া দুঃখজনক। তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বলা আমাদের প্রশাসনিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।” তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত মন্ত্রিপরিষদ বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার কাছে কোনো লিখিত অভিযোগে সই করেননি আবদুস সাত্তার। যোগাযোগ করা হলে সাত্তার শুধু বলেন, ‘সত্যের জয় হবেই।’ তবে বিস্তারিত প্রশ্নের জবাবে তিনি ফোন কেটে দেন। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সচিবের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন, আর বিএনপি বলছে, ‘সরকার নিজেরাই তদন্ত করলে নিরপেক্ষতা আসবে না।’
বিশেষজ্ঞদের মতামত
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, “অভিযোগের ধরন শুনে মনে হয় ‘হুইসেল-ব্লোয়ার’ হতে চেয়েছেন সাত্তার, কিন্তু প্রমাণ ছাড়া সে উদ্যোগ ভেস্তে গিয়েছে।” ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, “প্রমাণ থাকলে প্রকাশ করা, আর না থাকলে দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে সরাসরি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থায় গিয়ে জমা দেওয়াই উচিত।” উভয়জনই বলেন, অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা তা যাচাই করার একমাত্র উপায় হলো স্বচ্ছ তদন্ত—যাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বাদ থাকে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ জমা পড়লেই প্রশাসন প্রথম পর্যায়ে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান করবে; প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আনুষ্ঠানিক তদন্ত চাওয়া হবে। দুদকের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, অভিযোগকারীর পর্যাপ্ত তথ্য না দিলে অনুসন্ধান শুরু করা কঠিন। সরকারের তথ্য অধিকার আইন অনুসারে যেকোনো নাগরিক ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে বিস্তারিত জানতে পারবেন, যদি অভিযোগ দাখিল হয়।
বৃহত্তর চিত্র
বাংলাদেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সরকার পরিবর্তনের সময়ে উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। ২০০৭-০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক আমলেও একই ধরনের অভিযোগ উঠে, যেগুলোর বেশির ভাগই প্রমাণাভাবে টিকেনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ও দ্রুত তদন্ত না হলে একই বৃত্ত ঘুরে দেখবে দেশ, আর ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণের আস্থা। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হুইসেল-ব্লোয়ার সুরক্ষা আইন এবং স্বাধীন তদন্ত কাঠামোর দাবি আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে।
শেষ কথা
নির্বাচনের আগে প্রতিষ্ঠানবিরোধী যেকোনো অভিযোগ রাজনৈতিক মাত্রা পায়। এবারও অভিযোগ-প্রতিবাদের লড়াই শুরু হয়েছে। সত্যতা উন্মোচনে জরুরি হল নিরপেক্ষ, দ্রুত ও প্রমাণনির্ভর তদন্ত; অন্যথায় জনমনে প্রশ্ন থেকেই যাবে—কে ঠিক, কে ভুল?

