আলাস্কায় ট্রাম্প–পুতিন বৈঠক: ইউক্রেন যুদ্ধ থামার আশ্বাস নাকি নতুন রূপরেখা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগামী শুক্রবার আলাস্কার অ্যাঙ্কোরেজের উপকণ্ঠে অবস্থিত দূর নিয়ন্ত্রিত এক সামরিক ফ্যাসিলিটিতে মুখোমুখি বসতে সম্মত হয়েছেন। হোয়াইট হাউস ও ক্রেমলিন পৃথক বিবৃতিতে জানায়, আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, রুশ অধিকৃত অঞ্চল এবং উভয় দেশের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা। দীর্ঘ আলোচনার পর ভেন্যু হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য বা তুরস্কের বদলে আলাস্কা বেছে নেওয়া হয়েছে, যাতে দুই নেতা যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে থেকেও রাশিয়ার সীমান্তের কাছাকাছি অঙ্গরাজ্যে বৈঠক করতে পারেন। ১৯৬১ সালের ভিয়েনা সামিটের পর এই প্রথম দুই দেশের শীর্ষনেতা এত প্রত্যক্ষ সামরিক সংঘাতের সময়ে মুখোমুখি হচ্ছেন। বৈঠকের দিনই মার্কিন কংগ্রেসে ইউক্রেনকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, অন্যদিকে পুতিন সাম্প্রতিক ভাষণে ‘শান্তির পথ খুলে দিতে’ প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে কূটনীতিকরা বলছেন, মাত্র কয়েক ঘণ্টার এ বৈঠক থেকেই নির্ধারিত হতে পারে ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোর পরবর্তী অধ্যায়।
প্রেক্ষাপট
আলাস্কা একসময় রুশ সাম্রাজ্যেরই অংশ ছিল; ১৮৬৭ সালে মাত্র ৭.২ মিলিয়ন ডলারে অঞ্চলটি কিনে নেয় ওয়াশিংটন। বেরিং প্রণালী পেরিয়ে রাশিয়ান মূল ভূখণ্ড থেকে দূরত্ব সর্বোচ্চ ৮৬ কিলোমিটার, দুই দেশের দুই দ্বীপের মাঝে নূন্যতম ২.৫ মাইল। আজও উপদ্বীপজুড়ে রুশ অর্থোডক্স গির্জার পেঁয়াজ গম্বুজ কিংবা রুশ-আদিবাসী মিশ্র ভাষার痕 স্পষ্ট, যা বৈঠকের প্রতীকী ও ভৌগোলিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, ন্যাটো বা ইউরোপীয় রাজধানীর পরিবর্তে আলাস্কা বেছে নেওয়ার অর্থ—দুই শীর্ষনেতা তৃতীয় পক্ষের ক্যামেরা ও চাপের বাইরে তুলনামূলক ‘নিরপেক্ষ’ পরিবেশে কথা বলতে চাইছেন। একই সঙ্গে একশ পঞ্চাশ বছর আগের ‘সেওয়ার্ডের বোকামি’ নামে পরিচিত ক্রয়契 কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে পুতিনকে মনস্তাত্ত্বিক বার্তাও দিচ্ছেন ট্রাম্প—এখানে অতীতের ঋণ শোধ করার প্রশ্ন নেই, বরং ভবিষ্যতের বোঝাপড়া দরকার।
প্রতিক্রিয়া
বৈঠকের ঘোষণার পরই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে উদ্বেগ বাড়ছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান সতর্ক করেছেন—ইউরোপকে বাদ রেখে করা যে–কোনো সমঝোতা মহাদেশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। কিয়েভ একই সুরে জানিয়েছে, ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো ভূমি-বিনিময় চুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। ব্রাসেলস, প্যারিস ও বার্লিনের কূটনীতিকেরা রয়ে সয়ে বলছেন, আলোচনার ফল যদি ‘অবস্থা যেভাবে আছে’ সেভাবে বজায় রাখাকে বৈধতা দেয়, ইউক্রেন তা অবিলম্বে প্রত্যাখ্যান করবে। ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী আবার ট্রাম্পের সঙ্গে আছে, তবে ডেমোক্র্যাট সদস্যরা পুতিনকে ‘আমেরিকান মাটিতে আতিথেয়তা’ দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (আইএসডব্লিউ) বলছে, পুতিনের প্রাথমিক লক্ষ্য শান্তি নয়; বরং নিষেধাজ্ঞা কমিয়ে আনা ও সামরিক দখলকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া। চ্যাথাম হাউসের বিশ্লেষকরা মনে করেন, ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার আগে ইউরোপ ও ন্যাটোর প্রতি কম নির্ভর করে নিজস্ব ‘ডিল মেকিং’ স্টাইল দেখাতে চাইছেন। অপরদিকে মার্কিন নীতি–পর্যবেক্ষক টাইসন বার্কার ন্যাটোকে বলেছেন, কোনো সমঝোতায় ‘সুরক্ষার গ্যারান্টি’ ও আন্তর্জাতিক তদারকি না থাকলে তা আরেকটি যুদ্ধের বীজ রোপণ করবে। ইতিহাসবিদেরা ১৯৭۲ সালের নিক্সন–ব্রেজনেভ শীর্ষ সম্মেলনের সঙ্গে তুলনা টানছেন—সেই বৈঠক মিলেছিল ডেটঁতের সূচনা, তবে আফগানিস্তান ও অন্যান্য সংঘাত থামাতে পারেনি।
এরপর কী
বৈঠকসূচি অনুযায়ী স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ১০টায় বৈঠক শুরু, দুপুরের মধ্যে যৌথ বিবৃতি দেওয়ার পরিকল্পনা আছে, তবে সাংবাদিকদের সামনে দুই নেতা একসঙ্গে আসবেন কি না, তা নিশ্চিত করেনি হোয়াইট হাউস। ক্রেমলিন সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, আলোচনার পর পুতিন রুশ দূরপূর্বে ফিরবেন এবং ট্রাম্প ওভাল অফিসে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে পারেন। আমেরিকান সেনেট তখনই ৬০ বিলিয়ন ডলারের নতুন ইউক্রেন-প্যাকেজ নিয়ে ভোট করবে, যার ভাগ্য অনেকটা আলাস্কা আলোচনার সুরের ওপর নির্ভর করতে পারে। কিয়েভকে হয়তো ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে খসড়া প্রস্তাব দেখানো হবে, ইউক্রেন রাজি না হলে পরবর্তী রাউন্ড অনুষ্ঠিত হতে পারে ইস্তাম্বুলে—যেখানে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান মধ্যস্থতার স্বপ্ন দেখছেন। ইউরোপীয় নেতারা ইতোমধ্যে বৈঠকের ফলাফল বিশ্লেষণের জন্য ব্রাসেলসে জরুরি মিটিং ডাকতে শুরু করেছেন। ব্ল্যাক–সাবাথের মতো কোনো ‘সোপান’ না গড়ে বরং একাধিক ধাপে শান্তি প্রকল্প এগোবে—এটাই কূটনীতিক মহলের প্রধান ধারণা।

