অস্ট্রেলিয়ায় নতুন জীবন: ১৯ বছরে তৃষ্ণা–কৃষ্ণার পথচলার গল্প
খুলনায় ২০০৬-এর ডিসেম্বরে জন্ম নেওয়া তৃষ্ণা ও কৃষ্ণা মল্লিক ছিলেন মাথা জোড়া লাগানো জোড়া যমজ। মা–বাবা দেখভাল করতে না পেরে তাঁদের ঢাকার মাদার তেরেসা এতিমখানায় দেন। সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়ার দাতব্য সংস্থা ‘চিলড্রেন ফার্স্ট ফাউন্ডেশন’ ২০০৭ সালে শিশু দুটিকে মেলবোর্নে নিয়ে যায়। ২০০৯ সালের নভেম্বরে ৩২ ঘণ্টার জটিল অস্ত্রোপচারে সফলভাবে আলাদা করা হয় তাঁদের। এখন বয়স ১৯, অস্ট্রেলিয়ার বান্দুরা শহরে পালক মা ময়রা কেলির আদরে বেড়ে উঠছেন তাঁরা। তৃষ্ণা মাধ্যমিকের শেষ বর্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে প্রস্তুত; বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কৃষ্ণার নিবিড় পরিচর্যা চলছে। ২০২১ সালে কৃষ্ণার কিডনি বিকল হলে ময়রা নিজের একটি কিডনি দান করেন। জন্মদাতা মা–বাবাও ময়রার উদ্যোগে মেলবোর্নে, পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন দুই বোন।
পটভূমি
সাত বছর বয়স পর্যন্ত বাংলাদেশের স্মৃতিই ছিল তাঁদের সব। খুলনায় জন্ম, পরে ঢাকার আশ্রয়কেন্দ্র—এই পথ থেকেই শুরু। শিশু অধিকারকর্মী ময়রা কেলি ২০০৭ সালে দুই বোনের ছবি ও চিকিৎসা নথি হাতে পান এবং তাদের উদ্ধার করে অস্ট্রেলিয়ায় নেন। মেলবোর্নের রয়্যাল চিলড্রেনস হাসপাতালে ১৯ জন সার্জন–অ্যানেসথেটিস্টের সমন্বয়ে ৩২ ঘণ্টার ঐতিহাসিক অপারেশন হয় ২০০৯ সালের ১৭–১৯ নভেম্বর। সে দিনই ‘ট্রিশি’ ও ‘ক্রিসি’ নামে ডাক পায় তৃষ্ণা আর কৃষ্ণা। অস্ত্রোপচারের পর প্রথম দুই বছর ইনটেনসিভ রিহ্যাবিলিটেশনে কাটে; হাঁটা, কথা বলা ও মৌলিক কাজ শিখতে হয় নতুন করে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• বয়স: ১৯ বছর (জন্ম ২০০৬)
• অস্ত্রোপচারের সময়কাল: ৩২ ঘণ্টা
• সার্জন–নার্সের দল: ৩০-এর বেশি
• মোট মূল্য (চিকিৎসা ও পুনর্বাসন): আনুমানিক ২ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলার, যার পুরোটাই দাতব্য তহবিল থেকে
• কিডনি প্রতিস্থাপন: ২০২১, দাতা—ময়রা কেলি
• পরিবার: জন্মদাতা বাবা-মা + দুই ভাই; পালক মা ময়রা কেলি ও তাঁর দুই ছেলে সহ এক ছিমছাম বাড়ি, সবাই একই শহরে ১০ মিনিটের দূরত্বে বসবাস করেন
প্রতিক্রিয়া
টেলিফোনে প্রথম আলোকে ময়রা কেলি বলেন, ‘ট্রিশি এখন আমার বন্ধুর মতো; মাঝে মাঝে তর্ক করে। আর ক্রিসি সেই ছোট্ট মেয়েটিই রয়ে গেছে। তার একটুখানি হাসিই আমার কাছে আশীর্বাদ।’ চিকিৎসা দলের প্রধান নিউরোসার্জন অ্যালান ডেভিস স্মৃতি রোমন্থন করে অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশনকে বলেছেন, ‘দুই মাথা আলাদা করে এমন পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা আমরা খুব কমই দেখি—এটা পুরো টিমের কাছে অনুপ্রেরণা।’ বাংলাদেশের শিশু অধিকারকর্মীরা বলেন, এ ঘটনা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জটিল শিশুরোগ চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর দাবি জোরালো করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ময়রাকে ‘জীবন্ত মাদার তেরেসা’ আখ্যা দিয়ে ভাসাচ্ছেন প্রণতিতে।
এরপর কী
এখন মূল লক্ষ্য কৃষ্ণার ফিজিওথেরাপি ও ভাষাচর্চা বাড়ানো এবং তৃষ্ণার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি। ময়রা কেলির সংস্থা ইতিমধ্যে ‘ট্রিশি অ্যান্ড ক্রিসি স্কলারশিপ’ চালু করেছে যাতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন অন্য বাংলাদেশি শিশুদেরও অস্ট্রেলিয়ায় এনে জটিল চিকিৎসা করানো যায়। তৃষ্ণা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে চান, কারণ ‘নিজের অভিজ্ঞতা অন্যদের কাজে লাগাতে চাই।’ বাংলা শিখতে আগ্রহী দুই বোন; ময়রা তাঁদের জন্য ঢাকার একটি অনলাইন বাংলা কোর্সে নাম লিখিয়েছেন। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসা সহায়তা সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি ‘টেলিহেলথ’ চুক্তি করার উদ্যোগও চলছে। সব মিলিয়ে, দুই বোনের অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প নতুন পথের দিশা দেখাচ্ছে অনেককে।

