পল্লবীতে পুলিশি নির্যাতনে জনি হত্যা : দুই কর্মকর্তার যাবজ্জীবন বহাল, নজরে আরও বড় প্রশ্ন

পল্লবীতে পুলিশি নির্যাতনে জনি হত্যা : দুই কর্মকর্তার যাবজ্জীবন বহাল, নজরে আরও বড় প্রশ্ন

ঢাকার হাইকোর্ট আজ সোমবার (১১ আগস্ট) পল্লবী থানায় পুলিশ হেফাজতে চালক ইশতিয়াক হোসেন জনি হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেছে। বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান ও বিচারপতি এ কে এম রবিউল হাসানের বেঞ্চ তৎকালীন উপপরিদর্শক জাহিদুর রহমান ও এএসআই কামরুজ্জামানের যাবজ্জীবন সাজা বহাল রাখে। অপর এএসআই রাশেদুল হাসানের সাজা কমে ১০ বছর হয়েছে, আর পুলিশের সোর্স রাসেলকে খালাস দেওয়া হয়েছে। মামলার অন্য আসামি সুমন আগেই সাজাভোগ শেষে মুক্ত। ২০১৪ সালে পল্লবীতে বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে জনি ও তাঁর ভাইকে আটক করে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে; পরদিন ভোরে জনি মারা যান। ২০২০ সালে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রথম দণ্ড দেন।

প্রেক্ষাপট

৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ রাত সাড়ে দশটা। পল্লবীর কালশী এলাকার একটি বিয়ে বাড়ি থেকে বাড়ি ফিরছিলেন গাড়িচালক ইশতিয়াক হোসেন জনি ও তাঁর ছোট ভাই শহীদুল হোসেন রকু। পথিমধ্যে ওসি–সোর্স রাসেলের পূর্বশত্রুতার জেরে পুলিশ দু’জনকে ধরে নিয়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ। পল্লবী থানায় রাতভর মারধরের পর ভোরে জনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন এবং পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ঘটনার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জনির ভাই টর্চার অ্যান্ড কাস্টোডিয়াল ডেথ (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট ২০১৩ অনুযায়ী মামলা করেন—যা সে আইনে পুলিশের বিরুদ্ধে হওয়া প্রথম মামলা। তদন্তে নির্যাতনের প্রমাণ মেলে এবং ২০১৬ সালে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হয়। ২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত চার পুলিশ সদস্য ও সোর্স রাসেলকে যাবজ্জীবন দেয়; এই সাজার বিরুদ্ধে আসামিরা আপিল করেন, যার ওপর সোমবার হাইকোর্ট রায় দিল।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• মামলার আসামি ৫ জন; ২ জনের যাবজ্জীবন বহাল, ১ জনের সাজা ১০ বছরে কমে, ১ জন খালাস, ১ জন সাজা ভোগ করে মুক্ত।

• ঘটনাটি ঘটেছে ২০১৪; চার্জশিট ২০১৬; ট্রায়াল শেষ ২০২০; আপিল রায় ২০২5—মোট বিচারকাল ১১ বছর।

• আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব মতে ২০১৩ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত অন্তত ১৯৩টি হেফাজতে মৃত্যু ঘটেছে, যার ৭১টি থানায়। জনি হত্যা মামলাটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত কেস।

প্রতিক্রিয়া

রায়ের পর জনির মা রওশন আরা সাংবাদিকদের বলেন, "আমার ছেলের প্রাণ ফিরবে না, তবে আদালত দেখিয়ে দিল নির্যাতনের বিচার হয়।" মানবাধিকার সংগঠন আসকো বলেছে, হাইকোর্টের রায়ে ভুক্তভোগীদের কিছু আস্থা ফিরলেও সাজা কার্যকরের জন্য আপিল বিভাগের দ্রুত শুনানি জরুরি। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় জানায়, দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা বর্তমানে বহিষ্কৃত এবং বাহিনীতে জিরো টলারেন্স নীতি চালু আছে। তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার জরুরি বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল এ এফ হাসান আরিফ মনে করেন, ২০১৩ সালের আইনটি ব্যবহার করে এই রায় একটি মাইলফলক, কারণ এতে মামলা তুলে নেওয়ার প্রচলিত চাপ টেকেনি। তার মতে, "এখন চ্যালেঞ্জ হল, অপরাধীদের সাজা কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত নিয়মিত মনিটরিং করা"। অপরাধsocialogist ড. তানিয়া হক বলেন, এ ধরনের রায় জনগণের ভয় ভাঙাতে সহায়ক, কিন্তু পুলিশি জবাবদিহিতা বাড়াতে পৃথক নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা দরকার।

পরবর্তী পদক্ষেপ

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তারা আপিল বিভাগে যাবেন এবং জামিনের আবেদন করবেন। রাষ্ট্রপক্ষও খালাস পাওয়া পুলিশের সোর্স রাসেলের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখার কথা বলছে। আইন মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, মামলাটিকে নজির হিসেবে পুলিশি হেফাজত সংক্রান্ত এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর) হালনাগাদ করা হবে। meanwhile, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কারাবিধি সংশোধন ও সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর সুপারিশ করতে যাচ্ছে।

বৃহত্তর চিত্র

বাংলাদেশে হেফাজতে মৃত্যু বা নির্যাতনের বেশির ভাগ ঘটনারই মামলা হয় না, আবার মামলার প্রমাণ সংগ্রহও কঠিন। জনি হত্যা মামলায় ভিকটিমের পোশাক, মেডিকেল রিপোর্ট ও স্বীকারোক্তি—সব মিলিয়ে আদালত সন্তুষ্ট হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে আছে ২০১৩ সালের আইনে নির্দিষ্ট তদন্ত প্রক্রিয়া ও সর্বোচ্চ সাজার বিধান। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও থানাভিত্তিক সংস্কৃতি পাল্টানো না গেলে এমন বিচ্ছেদের হার স্বল্পই থাকবে। জনির পরিবারের দীর্ঘ বিচারযাত্রা তাই শুধুই একক ঘটনার নয়; এটি সিস্টেম পরিবর্তনের জন্য ডাকও বটে।

শেষ কথা

জনি বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর পরিবারের দৃঢ়তা এবং আদালতের রায় প্রমাণ করলো যে ন্যায়বিচার যত ধীরে আসুক, তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এখন দেখার বিষয়—আপিল বিভাগ ও পুলিশ সংস্কার প্রক্রিয়া এই বার্তাকে কত দূর এগিয়ে নিয়ে যায়।

More From Author

মেসি ছাড়া হতাশাজনক ৪-১ হার, পয়েন্ট তালিকায় পিছিয়ে গেল ইন্টার মায়ামি

রাঙ্গুনিয়ায় ইয়াবাসহ গ্রেফতার ‘মাদক সম্রাট’ মাসুক; এলাকায় স্বস্তি ও প্রশ্ন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *