চৌগাছার সাবেক মেয়র মামুন হিমেল চেক ডিজঅনার মামলায় এক বছরের কারাদণ্ড
যশোরের অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত ২৫ জুন সাবেক চৌগাছা পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সদস্য মো. নুর উদ্দীন আল মামুন হিমেলকে (৪৮) এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। ২০২০ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি, চৌগাছা শাখার করা চেক ডিজঅনার মামলায় রায়ে আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—বিতর্কিত চেকের সমপরিমাণ ১ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার ২০ টাকা ব্যাংককে ফেরত দিতে হবে। হিমেল ইটের ব্যবসার জন্য ২০১৮-তে ব্যাংক থেকে নেওয়া ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ না করে খালি চেক জমা দেন, যা নিষ্প্রাণ (ডিজঅনার) হয়। রায়ের আগে আসামিপক্ষ অক্টোবরে টাকা পরিশোধের সময় চেয়ে আবেদন করেছে।
প্রেক্ষাপট
ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, ২০১৮ সালে ইটভাটার মূলধন বাড়াতে ন্যাশনাল ব্যাংকের চৌগাছা শাখা থেকে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা ঋণ নেন মামুন হিমেল। কিছু কিস্তি পরিশোধের পর অবশিষ্ট ১ কোটি ৩০ লাখ ৯০ হাজার টাকা বকেয়া থাকে। ব্যাংক বারবার তাগাদা দিলেও তিনি টাকা মেটাননি। ২০১৯ সালের শেষ দিকে তিনি ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার একটি চেক ব্যাংকে জমা দেন। চেকটি ২০২০ সালের জানুয়ারিতে পেশ করা হলে হিসাবটিতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় তা ডিজঅনার হয়। চেক ডিজঅনার আইনের (১৮৮১ সালের নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ধারা ১৩৮) আওতায় ব্যাংক ওই বছরের জুলাইয়ে আদালতে মামলা করে।
প্রতিক্রিয়া
রায় ঘোষণার পর ন্যাশনাল ব্যাংকের চৌগাছা শাখার ব্যবস্থাপক মোস্তফা রহমান সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা আদালতের রায়ে সন্তুষ্ট। গ্রাহকের টাকা সুরক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব; তাই আমরা বাধ্য হয়েই মামলা করেছি।" তবে তিনি জানান, রায় লেখিতভাবে পাওয়ার আগেই আসামিপক্ষ ব্যাংকে চিঠি দিয়ে অক্টোবরে সমস্ত বকেয়া পরিশোধের সুযোগ চেয়েছে। বারবার ফোন করেও মামুন হিমেলের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্র জানায়, দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও তিনি প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত; রায় নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ মন্তব্য করতে চাইছেন না।
পরবর্তী পদক্ষেপ
আইনজীবীরা জানান, রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে জেলা জজ আদালত বা হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ আছে। আপিল গৃহীত হলে সাজা স্থগিত রাখারও আবেদন করা যায়। তবে টাকা ফেরত না দিলে জামিন পাওয়া বেশ জটিল। ব্যাংক চাইলে রায় অনুসারে অর্থসৃষ্টি আইনের ধারায় আসামির স্থাবর সম্পত্তি জব্দের উদ্যোগও নিতে পারে। ব্যাংক কর্মকর্তা মোস্তফা রহমান বলেন, "নগদ পরিশোধ বা আদালতের নির্দেশনা—য whichever comes first। আমরা আইনি প্রক্রিয়াই অনুসরণ করব।"
বৃহত্তর চিত্র
বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০ হাজারের বেশি চেক ডিজঅনার মামলা নথিভুক্ত হয় (আইন মন্ত্রণালয়, ২০২৩)। ব্যবসায়িক লেনদেনে নগদ কমে যাওয়ায় পোস্ট-ডেটেড চেকের ব্যবহার বেড়েছে, যার একটি অংশই অর্থহীন হয়ে আদালতে গড়ায়। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘসূত্রিতা, আপসের প্রবণতা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আসামির কারণে ব্যাংকগুলো মামলা করতে গড়িমসি করে; এতে খেলাপি ঋণও বাড়ে। জহিরুল ইসলাম, সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, বলেন, "জামিনযোগ্য হওয়ায় আসামিরা দীর্ঘ আইনি লড়াই চালিয়ে দেন, ফলে ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ে। দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ইলেকট্রনিক চেক ক্লিয়ারিংয়ের কড়াকড়ি বাড়ানো জরুরি।" বর্তমান রায়টি বিচার ব্যবস্থার দ্রুততার একটি বিরল উদাহরণ; মামলার তিন বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রায় এসেছে।

