রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীতে বালু উত্তোলন ঘিরে সংঘর্ষ, আগুনে পুড়ল পাঁচ ড্রেজার
রবিবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ও পোমরা এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে বালু উত্তোলনের পাঁচটি ড্রেজারে আগুন দেয় এবং দুই শ্রমিককে মারধর করে প্রায় ৩০-৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি। দগ্ধ ও আহত শ্রমিকদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ইজারাদার প্রতিষ্ঠান আহম্মদ মোস্তফা ট্রেডার্স অভিযোগ করেছে, চাঁদা না পেয়ে প্রতিপক্ষ হামলা চালিয়েছে; কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনে ভাঙন বেড়ে যাওয়ায় জনরোষ থেকে এই হামলা হয়েছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনী পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনার নেপথ্যে চাঁদাবাজি, পরিবেশগত ক্ষতি ও স্থানীয় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব—তিন দিকই জোরালো বলে এলাকাবাসী ও প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে।
পটভূমি
কর্ণফুলী নদীর এই অংশে বহু দিন ধরে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন হচ্ছে। ইজারা পেয়ে আহম্মদ মোস্তফা ট্রেডার্সসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ‘বৈধ কাগজ’ দেখালেও স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, নির্দিষ্ট সীমা ও সময় না মেনে যত্রতত্র বালু তোলা চলছে। এতে সরফভাটা মৌলানা গ্রাম ও পোমরা ইউনিয়নের কয়েকটি চর দ্রুত নদীগর্ভে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঝুঁকিতে পড়েছে শতাধিক বাড়ি, একটি কবরস্থান ও বাচা বাবার মাজার। সম্প্রতি এলাকাবাসী ইউএনও ও জেলা প্রশাসকের দপ্তরে স্মারকলিপি দিলে অভিযান না চলায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
প্রতিক্রিয়া
আহম্মদ মোস্তফা ট্রেডার্সের ম্যানেজার মো. দিদারুল ইসলাম জানান, ‘চাঁদা’ চেয়ে কয়েক জন স্থানীয় সন্ত্রাসী আগেও হুমকি দিয়েছিল। টাকা না পেয়ে তারা রোববার ভোরে এসে পাঁচটি গেটবল, দুটি ড্রেজার ইঞ্জিন, তিনটি হোস পাইপ ও একটি স্পিডবোট পুড়িয়ে দেয়, সঙ্গে থাকা শ্রমিক মামুন ও রাকিবকে লাঠি দিয়ে মারে এবং মোবাইল-নগদ টাকা লুট করে। অন্যদিকে, সরফভাটা পাইট্টেলিকুল জামে মসজিদের এক মুয়াজ্জিন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শ্রমিকরা রাতে ড্রেজার চালিয়ে নদী-কূল গিলে ফেলছে, আমরা জীবন নিয়ে আতঙ্কে আছি। প্রশাসন চুপ, তাই মানুষ নিজেই প্রতিরোধে নেমেছে।’ ইউএনও মো. কামরুল হাসান সাংবাদিকদের জানান, দুই পক্ষই মৌখিক অভিযোগ দিয়েছে; তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• হামলাকারী: প্রায় ৩০–৪০ জন (পুলিশ অনুমান)
• আগুন দেওয়া ড্রেজার: ৫টি
• সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে: ৩টি ড্রেজার, ২টি গেটবল
• আহত: শ্রমিক ৪ জন; হাসপাতালে ভর্তি ২ জন
• ক্ষয়ক্ষতি দাবি: প্রায় ৮০ লাখ টাকা (ইজারাদার পক্ষের হিসাব)
• নদী ভাঙনে ঝুঁকিতে: ২০০+ পরিবার (স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনুমান)
এরপর কী
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন বালু মহাল আইনে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে যাচ্ছে, একটি পরিবেশগত ক্ষতি, আরেকটি সহিংসতার পটভূমি খতিয়ে দেখবে। পুলিশ অজ্ঞাত হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে; সিসিটিভি ও মোবাইল ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তর আগামী সপ্তাহে ড্রেজারগুলো বৈধ নাকি অতি-সীমা অতিক্রম করেছে তা সরজমিনে পরিমাপ করবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত বিকল্প ভাঙনরোধী ব্যবস্থা ও টেকসই বালু নীতি না আনলে নদীপাড়ের মানুষ বারবার এমন সহিংস পথে যেতে পারে।

