দুই ঘণ্টা দেরির জের, জান আলী হাটে অল্পের জন্য বড় দুর্ঘটনা এড়াল পর্যটক ও প্রবাল এক্সপ্রেস
চট্টগ্রাম–কক্সবাজার একমাত্র লুপ লাইনের জান আলী হাট স্টেশনে রবিবার দুপুরে পর্যটক এক্সপ্রেস ও বিপরীতমুখী প্রবাল এক্সপ্রেসের অপ্রত্যাশিত ক্রসিং হয়। কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস দুই ঘণ্টা দেরি করে ছাড়ায় নির্ধারিত দোহাজারী স্টেশনের পরিবর্তে ১৭ বগির সীমাবদ্ধ জান আলী হাটে ট্রেন দুটির মুখোমুখি হওয়ার ব্যবস্থা নিতে হয়। ভাগ্যক্রমে প্রবাল এক্সপ্রেসের কোচ সংখ্যা ১৭–তেই সীমিত থাকায় উভয় ট্রেনই নিরাপদে পাশ কাটাতে পারে এবং প্রায় ৮০০ যাত্রী বড় ধরনের সংঘর্ষ থেকে বেঁচে যান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন স্টেশন মাস্টার নেজাম উদ্দিন। বাহ্যত ত্রুটি এড়ানো গেলেও, ঘটনা আবারও একক লাইনে চালিত গুরুত্বপূর্ণ রুটটির ধারণ ক্ষমতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সামনে নিয়ে এসেছে।
পটভূমি
দোহাজারী–কক্সবাজার নতুন রেলপথ আংশিক চালুর আগে পর্যন্ত চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের সব ট্রেন চট্টগ্রাম–দোহাজারী একক লাইনে চলাচল করে। লাইনটিতে কয়েকটি ছোট স্টেশন ছাড়া পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ক্রসিংয়ের সুবিধা শুধু দোহাজারী স্টেশনেই রয়েছে। জান আলী হাট স্টেশনটি ১৭ বগি পর্যন্ত ট্রেন রাখার লাইনের জন্য নির্মিত, যা বাংলাদেশ রেলের বর্তমান নন–ইলেকট্রিফায়েড লুপ স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে ছোট। সাধারণত পর্যটক এক্সপ্রেস সকাল ৯টা নাগাদ চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়ে বেলা ১১টার মধ্যে দোহাজারীতে প্রবাল এক্সপ্রেসের সঙ্গে ক্রসিং শেষ করে কক্সবাজারের দিকে এগোয়। কিন্তু রোববার যান্ত্রিক ত্রুটি ও প্রচণ্ড ভিড়ের কারণে ট্রেনটি ১১টা ৪০–এ চট্টগ্রামে পৌঁছায় এবং প্রায় ২টা নাগাদ জান আলী হাটে পৌঁছায়, যেখানে ইতিমধ্যেই প্রবাল এক্সপ্রেস অপেক্ষা করছিল।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• জান আলী হাট স্টেশনের ক্রসিং লুপের সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতা: ১৭ বগি
• রবিবার প্রবাল এক্সপ্রেসের কোচ সংখ্যা: ১৭
• সম্ভাব্য যাত্রী সংখ্যা (উভয় ট্রেনে): প্রায় ৮০০
• পর্যটক এক্সপ্রেসের দেরি: প্রায় ২ ঘণ্টা
• নির্ধারিত ক্রসিং স্টেশন থেকে দূরত্ব: প্রায় ১৫ কিলোমিটার
প্রতিক্রিয়া
স্টেশন মাস্টার নেজাম উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, '১৮ বা ১৯ বগির বেশি হলে এখানে ক্রসিং করা যেত না, তখন একটি ট্রেনকে দোহাজারী পর্যন্ত পেছনে পাঠাতে হতো, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।' বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় পরিবহন ব্যবস্থাপক মো. আজিজুল হক সাংবাদিকদের জানান, 'এটি গতি নিয়ন্ত্রণ ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার সমন্বয়ে সমাধান করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে ডুয়েল লাইনই একমাত্র টেকসই উপায়।' সোশ্যাল মিডিয়ায় যাত্রীরা ধীরগতির ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, ঘন ঘন দেরি এবং কোচ সংকটের অভিযোগ তুলেছেন।
বিশ্লেষণ
দোহাজারী–কক্সবাজার প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই রুটে ৯০ কিলোমিটার জুড়ে একক লাইনই রয়ে যাচ্ছে, ফলে প্রতিটি ট্রেনের সময়সূচি একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। পর্যটন মৌসুমে অতিরিক্ত বগি সংযোজন করলে লুপ স্টেশনগুলোর ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, যা স্থানে স্থানে রেলকে জরুরি সিদ্ধান্তে বাধ্য করে। প্রবল বর্ষা ও সাগর–কেন্দ্রিক কাদা ধসের ঝুঁকি নিয়েও কক্সবাজারগামী লাইনটি নাজুক। রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বয়ংক্রিয় সিগন্যাল ও কমিউনিকেশন সিস্টেম না থাকায় ধীরগতির মানুষের ওপর নির্ভরশীল অপারেশন এখনও এই রুটের প্রধান দুর্বলতা। ভারতের কয়েকটি রুটে স্মার্ট ‘রাউন্ড ট্রিপ’ ডিসকাউন্ট ও কলকাতায় চালু হওয়া এসি লোকালের উদাহরণ দেখিয়ে তারা তীব্র প্রতিযোগিতার দিকটিও তুলে ধরছেন।
এরপর কী
ঈদ এবং শীতকালীন পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে রেলপথ মন্ত্রণালয় কক্সবাজার লাইনে অন্তত দুটি অতিরিক্ত লুপ স্টেশন সম্প্রসারণ এবং অস্থায়ীভাবে ২০ বগি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রেখেছে। পাশাপাশি দোহাজারী–কক্সবাজার ডাবল লাইন প্রকল্পের অর্থায়ন জট উন্মুক্ত করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে নতুন করে আলোচনাও চলছে। ততদিন নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে ট্রেন চালানোর জন্য চালক, গার্ড ও স্টেশন মাস্টারদের তাৎক্ষণিক ওয়াকি–টকি যোগাযোগ জোরদার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ের তথ্য কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, 'গণপরিবহনের আস্থার স্বার্থে ভবিষ্যতে অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি এড়াতে আমরা ট্রেন ট্র্যাকিং অ্যাপ আপডেট করছি, যাতে যাত্রীরা রিয়েল টাইমে গন্তব্য বুঝে স্টেশনে আসতে পারেন।'
শেষ কথা
রবিবারের ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর নেই, তবু এটি ছিল একটি সতর্ক সংকেত—একক লাইনে অতিরিক্ত চাপ দিয়ে চলা ঝুঁকির স্পষ্ট উদাহরণ। রেলপথ সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ বাস্তবায়নে গতি না বাড়ালে ভবিষ্যতে ভাগ্যের ওপর ভরসা রেখে আর কতবার রক্ষা পাওয়া যাবে—সেটাই বড় প্রশ্ন।

