আনোয়ারা শিল্পাঞ্চলে আবার বন্য হাতির হানা, আতঙ্কে শ্রমিক ও বাসিন্দারা
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী ইপিজেড (কেইপিজেড) এলাকায় প্রায় সাড়ে তিন মাস পর আবারও একটি বন্য হাতির পাল দেখা দিয়েছে। দাইনিক আজাদীকে উদ্ধৃত করে জানা গেছে, হাতিগুলো আসা–যাওয়ার পথে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকে, কারখানার পাশের গাছ ভাঙে এবং খাবারের খোঁজে বাড়িঘরে ঢুকে পড়ে। এতে ৩৫ হাজার শ্রমিকসহ আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার দুই লাখের বেশি মানুষ নতুন করে ঝুঁকিতে পড়েছে। গত সাত বছরে একই পাল ২৪ জনকে হত্যা ও দুই শতাধিক মানুষকে আহত করেছে বলে স্থানীয় নেতারা দাবি করছেন।
পটভূমি
কেইপিজেড সংলগ্ন পাহাড়ি বন থেকে হাতির দল historically চুনতি অভয়ারণ্য পর্যন্ত চলাচল করত। পাহাড় কাটা, রাস্তা ও শিল্পকারখানা নির্মাণে সেই করিডোর সংকুচিত হয়েছে। গত মে মাসে হাতির পালটি নির্দিষ্ট করিডোর ধরে অভয়ারণ্যে ফিরে গেলেও বন বিভাগের পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় তারা আবার শিল্প এলাকায় ঢুকে পড়েছে বলে দাইনিক আজাদীকে জানান হাতি রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট নুরুল আজিম।
প্রতিক্রিয়া
কেইপিজেড–এ কর্মরত শ্রমিক নাহিদা আক্তারের কণ্ঠে আতঙ্ক স্পষ্ট: “সকাল-বিকেল কাজের সময় হাতিগুলো সড়কে দাঁড়িয়ে থাকে। বিশাল দেহ দেখে দৌড়ে পালানোরও উপায় থাকে না।” ইপিজেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. মুশফিকুর রহমান জানান, “হাতিরা চলে যাওয়ার খবর পেয়ে সবাই স্বস্তিতে ছিলাম। এখন আবার কাজ বন্ধ করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।” বসতবাড়ি রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দারা বাঁশের বেড়া ও আলো ঝলমলে লাইট লাগাচ্ছেন, কিন্তু তাতে খুব একটা লাভ হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
আইইউসিএন-বাংলাদেশের হাতি বিশেষজ্ঞ ড. শরীফ আহমেদ বলেন, “চট্টগ্রাম অঞ্চলে এখন সর্বোচ্চ ১২০টির মতো এশীয় হাতি রয়েছে। চলাচলের করিডোর জায়গায় কারখানা ও রাস্তা তৈরি হওয়ায় তারা বিকল্প পথ খুঁজছে এবং লোকালয়ে ঢুকছে।” তাঁর মতে, “কেবল তাড়ানোর কৌশল ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে; করিডোর পুনরুদ্ধার, বৈদ্যুতিক ফেন্স ও পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত না করলে সংঘর্ষ বাড়বে।”
এর গুরুত্ব কী
বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে হাতি হত্যা দণ্ডনীয় হলেও মানুষও প্রাণ হারাচ্ছে, আর শিল্প কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যেই পড়েছে হাতির ১২টি ঐতিহ্যবাহী চলাচল পথ। তাই মানব-হাতি দ্বন্দ্ব এখন শুধু বন্যপ্রাণী রক্ষার বিষয় নয়, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও শ্রমিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তা একেএম শাহেদুল ইসলাম টেলিফোনে জানান, বন বিভাগ ‘র্যাপিড রেসপন্স টিম’ গঠন করেছে, যারা মাইকিং ও আতশবাজি ব্যবহার করে হাতি দূরে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। পাশাপাশি, চুনতি অভয়ারণ্যে ফিরিয়ে নিতে হাতি পরিবহন ও ট্র্যাকিংয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে টিমে জনবল সংকট এবং পর্যাপ্ত ড্রোন না থাকায় দ্রুত সমাধান মিলছে না। জেলা প্রশাসন ক্ষতিপূরণ দিতে নতুন তালিকা করছে, আর অধিকারকর্মীরা হাতির করিডোর চিহ্নিত করে আইনি সুরক্ষা দাবি করেছেন।
শেষ কথা
কেইপিজেডের শ্রমিকদের দুশ্চিন্তা, স্থানীয়দের ক্ষয়ক্ষতি আর হাতির বেঁচে থাকার লড়াই—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের এ ঘটনা বাংলাদেশে মানব-বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্ব নিরসনের জরুরি প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে। স্থায়ী সমাধানের জন্য দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে না পারলে প্রাণহানি ও আর্থিক ক্ষতি দুই-ই বাড়ার আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে।

