দুর্নীতি মামলায় নিজেকে ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বলছেন টিউলিপ সিদ্দিক

দুর্নীতি মামলায় নিজেকে ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বলছেন টিউলিপ সিদ্দিক

ব্রিটিশ লেবার পার্টির এমপি ও শেখ হাসিনার ভাগনি টিউলিপ সিদ্দিক দাবি করেছেন, তাঁকে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ হতে হয়েছে। লন্ডনে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ৪২ বছর বয়সী টিউলিপ তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে আনা ৫০০ কোটি ডলার তছরুপ, প্লট বণ্টনে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সম্পত্তি গ্রহণ–সহ সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। গত জানুয়ারিতে অভিযোগের চাপের মধ্যে তিনি যুক্তরাজ্যের শ্যাডো সরকারে রাখা মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন, যদিও নিজ দল লেবার পার্টি আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর বিরুদ্ধে এখনও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। আগামী সোমবার ঢাকার একটি দুর্নীতি দমন আদালতে মামলার প্রাথমিক শুনানি শুরু হওয়ার কথা; সেখানে তিনি সশরীরে বা ভিডিও লিংকে হাজির হবেন কি না, সেটি এখনো চূড়ান্ত করেননি।

পটভূমি

টিউলিপ সিদ্দিক ২০১৫ সাল থেকে উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড ও কিলবার্ন আসনের এমপি। ব্রিটিশ রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটলেও বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক বন্ধনই এখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি আলাদা অভিযোগ তদন্ত করছে—রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প থেকে ৫০০ কোটি ডলার তছরুপ, পূর্বাচলে আত্মীয়দের প্লট বরাদ্দে প্রভাব খাটানো এবং লন্ডনের কিংস ক্রসের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট গ্রহণ। মামলার মূল প্রমাণ হিসেবে রাশিয়া সফরের একটি ছবি তুলে ধরা হচ্ছে, যেখানে ২০১৩ সালে ভ্লাদিমির পুতিনের পাশে টিউলিপকে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। দুদক বলছে, সে সফরেই প্রকল্পের ‘কমিশনের’ পরিকল্পনা হয়েছিল।

প্রতিক্রিয়া

দ্য গার্ডিয়ানকে টিউলিপ বলেন, "বাংলাদেশে কেউ অপরাধ করে থাকলে শাস্তি পাওয়া উচিত, কিন্তু আমি সেই তালিকায় নেই। সব অভিযোগই অবাস্তব ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।" তিনি দাবি করেন, কিংস ক্রসের ফ্ল্যাটটি একজন ঘনিষ্ঠ পারিবারিক বন্ধুর কাছ থেকে বাজারদরের ভিত্তিতে ভাড়া নিয়েছেন, যাঁর রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এর আগে অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে ওই ফ্ল্যাট বাবা–মার কাছ থেকে উপহার পাওয়ার কথা বলেছিলেন—বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তিনি "ভারতীয় উপমহাদেশীয় পরিবারের সম্পত্তি বণ্টন জটিলতা" উল্লেখ করে ব্যাখ্যা দেন। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি দেখিয়ে নিজের ক্রিকলউডের বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে ওঠার বিষয়েও তিনি যুক্তরাজ্যের নিরাপত্তা সংস্থার পরামর্শের কথা তুলে ধরেন। লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার এখনও প্রকাশ্যে টিউলিপের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলেননি; তবে পার্টির ভেতর থেকে গুটিকয়েক এমপি সামাজিক মাধ্যমে তাঁর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন।

বৃহত্তর চিত্র

বাংলাদেশে শেখ হাসিনা ও নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. ইউনূসের সম্পর্ক বহু বছর ধরেই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। টিউলিপের ভাষ্য, এই বৈরিতাই এখন লন্ডন পর্যন্ত টেনে আনা হয়েছে। ব্রিটিশ গণমাধ্যমেও বিষয়টি আলোচনায়; ফিন্যানশিয়াল টাইমস থেকে শুরু করে বিবিসি অনেক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তুলেছে—বাংলাদেশের ‘ঘরোয়া’ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব কীভাবে যুক্তরাজ্যের শীর্ষ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধেও প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, ‘আইনি প্রক্রিয়া’ অনুযায়ীই সব কিছু হচ্ছে, আর প্রয়োজনে টিউলিপের অনুপস্থিতিতেও বিচার চলবে। যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও ২০০৩ সালের মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স চ্যানেল ব্যবহার করে আসামি হস্তান্তরের উদাহরণ আছে—যা টিউলিপের পক্ষে উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

এরপর কী

সোমবার শুরু হতে যাওয়া অভিযানের শুনানিতে আদালত প্রথমে অভিযোগপত্র গৃহীত হবে কিনা, তা নির্ধারণ করবে। গ্রহণ করলে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের ধাপ শুরু হবে, যা মাসের পর মাস—এমনকি বছরের পর বছরও চলতে পারে। টিউলিপ ইতিমধ্যে লন্ডনের বিখ্যাত ব্যারিস্টার হোগো কীথ কেসি’র কাছে আইনি পরামর্শ নিয়েছেন। তিনি হাজিরা না দিলে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারে, যা ইন্টারপোল ‘রেড নোটিস’ আকারে কার্যকর করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। এদিকে লেবার পার্টি আগামী সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখে ‘ক্লিন আপ’ ইমেজ বজায় রাখতে চাইবে; ফলে দলের ভেতর থেকেও তাঁর উপর চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা–ইউনূস ঠান্ডা বিরোধ আবার নতুন করে উত্তপ্ত হওয়ার আভাস দিচ্ছে, যার আঁচ হয়তো আরও কিছুদিন লন্ডন পর্যন্ত গিয়ে লাগবে।

More From Author

কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনে বালু উত্তোলন বন্ধে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ

কক্সবাজার রেলস্টেশনের স্ক্যানার দেড় ঘণ্টা চলেই থেমে গেল, নিরাপত্তা শঙ্কায় যাত্রীরা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *