কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনে বালু উত্তোলন বন্ধে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ

কক্সবাজারের সংরক্ষিত বনে বালু উত্তোলন বন্ধে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ

কক্সবাজারের চকরিয়া, রামু ও উখিয়া উপজেলার সংরক্ষিত–রক্ষিত বনাঞ্চল সংলগ্ন নয়টি বালুমহালের ইজারা কার্যক্রম রবিবার হাইকোর্ট স্থগিত করেছে। বিচারপতি কাজী জিনাত হক ও বিচারপতি আইনুন নাহার সিদ্দিকার বেঞ্চ বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) দায়ের করা রিটের প্রাথমিক শুনানিতে এ আদেশ দেয়। আদালত জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তিন মাসের মধ্যে বালু উত্তোলনে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ এবং ইজারাগ্রহীতা ও অন্য দায়ীদের নামসহ প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে কেন এসব বালুমহালকে বেআইনি ও জনস্বার্থ-বিরোধী ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে।

পটভূমি

গত ১১ মার্চ কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য জেলাটির পাঁচ উপজেলায় মোট ২৭টি বালুমহালের ইজারার দরপত্র আহ্বান করেন। এগুলোর মধ্যে ৯টি—চকরিয়ার খুটাখালী-১, রামুর ধলিরছড়া ও পানিরছড়া, উখিয়ার বালুখালী-১, উয়ালাপালং, দোছড়ি, পালংখালী, হিজলিয়া, ধোয়াংগারচর ও কুমারিয়ারছড়া—সংরক্ষিত বা রক্ষিত বনের ভেতর বা একেবারেই সন্নিকটে অবস্থিত। পরিবেশগত ঝুঁকি তুলে ধরে উত্তর ও দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তারা আগেই জেলা প্রশাসককে ওই ৯টি মহাল বাদ দিতে অনুরোধ করেন। অনুরোধ উপেক্ষা করে প্রথম ধাপে তিনটি মহালের ইজারা দেওয়া হলে বেলা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়।

এর গুরুত্ব কী

কক্সবাজারের উপকূলীয় বনাঞ্চল শুধু বন্য প্রাণীর আবাস নয়, পাহাড়ধস ও লবণাক্ত জলোচ্ছ্বাস থেকে স্থানীয় মানুষকেও রক্ষা করে। এসব অঞ্চলে বালু উত্তোলন পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে, পানি প্রবাহ বদলে দেয় এবং বন্য হাতি-হরিণের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত করে। পরিবেশবিদেরা বলছেন, পর্যটন ও রোহিঙ্গা শিবিরের চাপের মধ্যেও যেসব বন টিকে আছে, সেগুলোর ভেতর বালু মহাল ঘোষণাকে ‘সুইস-চিজ’-এর মতো গর্তের ভেতর গর্ত তৈরি করার শামিল। আদালতের এ স্থগিতাদেশ তাই স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগ ও পরিবেশবাদীদের স্বস্তি দিয়েছে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপরে বিচার বিভাগীয় নজরদারির কথা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে।

প্রতিক্রিয়া

বেলার আইনজীবী এস হাসানুল বান্না প্রথম আলোকে বলেন, “বনের মধ্যে বালুমহাল অনুমোদন করা সংবিধানের ১৮-ক ধারার স্পষ্ট লঙ্ঘন। আদালত তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়ে উদাহরণ স্থাপন করেছে।” বন বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “ইজারা স্থগিত হওয়ায় অন্তত এখনই বনজ সম্পদ রক্ষা করা যাবে, তবে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা দরকার।” জেলা প্রশাসনের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “আদালতের নির্দেশনা হাতে পেলে আমরা পূর্ণ সহযোগিতা করব।” ফেসবুক ও স্থানীয় গণমাধ্যমে অনেক নাগরিক রায়কে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে পরিবেশকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

৯ — স্থগিত হওয়া বালুমহালের সংখ্যা

২৭ — ২০২৫-২৬ সালের জন্য তালিকাভুক্ত মোট বালুমহাল

৩ — আগে থেকেই ইজারা দেওয়া মহাল

৩ — মাসের মধ্যে ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন দেওয়ার সময়সীমা

৫ — কক্সবাজার জেলায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা সংখ্যা

১৪৩২ — বাংলা সনের অর্থবছর, যেটির জন্য ইজারা ডাকা হয়েছিল

পরবর্তী পদক্ষেপ

একাধিক সরকারি দপ্তরকে একত্রে কাজ করে ক্ষতির পরিমাপ, দায়ীদের তালিকা ও সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিতে হবে। আদালতের রুলের জবাবে সরকার ও জেলা প্রশাসনকে দেখাতে হবে—কেন বনের ভেতরের বা সন্নিকটের বালুমহাল বৈধ হওয়া উচিত। পরবর্তী শুনানিতে আদালত ইজারা সম্পূর্ণ বাতিল, ক্ষতিপূরণ আদায় কিংবা পুনর্বাসনমূলক নির্দেশ দিতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বন বিভাগকে নিয়ে সমন্বিত ‘বালুমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা’ হালনাগাদ করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যাতে অনুরূপ সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে প্রশাসনিক পর্যায়েই প্রতিরোধ করা যায়।

More From Author

ধানমন্ডিতে অভিযানে ধরা পড়লেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, সহ–কর্মীরা বলছেন ‘রাজনৈতিক গ্রেপ্তার’

দুর্নীতি মামলায় নিজেকে ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’ বলছেন টিউলিপ সিদ্দিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *