ধানমন্ডিতে অভিযানে ধরা পড়লেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, সহ–কর্মীরা বলছেন ‘রাজনৈতিক গ্রেপ্তার’
ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট রোববার বিকেল সাড়ে ৫টায় ধানমন্ডির একটি নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে সরিষাবাড়ী উপজেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি মো. হৃদয় হাসান লাবলু (২৮)-কে গ্রেপ্তার করেছে। সিটিটিসির সহকারী কমিশনার জিয়াউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, গত ১১ জুলাই মিরপুর কাজীপাড়ায় নিষিদ্ধ বাংলাদেশ ছাত্রলীগের মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার পর থেকেই হৃদয় পলাতক ছিলেন। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযান চালানো হয়।
পুলিশ বলছে, এ নিয়ে চলতি মাসে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতাকে ধরা হলো। এর আগে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে ৯ আগস্ট ভোরে আলাউদ্দিন নামে আরেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, শিগগিরই আরও ধরপাকড় চলবে; অন্যদিকে ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গ্রেপ্তারকে ‘রাজনৈতিক হয়রানি’ বলে অভিহিত করেছেন।
পটভূমি
গত ১১ জুলাই রাজধানীর মিরপুর কাজীপাড়া এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একটি আকস্মিক মিছিলে নেতৃত্ব দেন হৃদয় হাসান। সেদিন স্লোগানে তাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের ‘দুর্নীতি বিরোধী অভিযান’ বন্ধের দাবি তোলেন এবং নিষিদ্ধাদেশ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ করলে হৃদয়সহ কয়েকজন পালিয়ে যান। ঘটনাস্থলে দাঙ্গা পুলিশ লাঠি ও ব্যানার উদ্ধার করে এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা নেয়। সিসিটিভি ও সোশ্যাল মিডিয়া ফুটেজ বিশ্লেষণের পর সিটিটিসি হৃদয়ের পরিচয় নিশ্চিত করে। রোববার ধানমন্ডির ১২ নম্বর সড়কের একটি ১০ তলা ভবনের ৭ তলায় তিনি লুকিয়ে ছিলেন বলে পুলিশের দাবি। তাঁকে গ্রেপ্তারের সময় মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ জব্দ করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে ‘সংগঠনের কথিত নির্দেশনা’ সংবলিত নথি পাওয়া গেছে বলে তদন্ত কর্মকর্তারা জানান।
প্রেক্ষাপট
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম সরকার সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করার পর থেকেই গোটা দেশে ধরপাকড় চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর যেকোনো প্রকাশ্য জমায়েত, পোস্টার-ব্যানার বা অনলাইন প্রচারণা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গৃহীত হচ্ছে। কর্ণফুলীর জুলধায় ১৬ মে রাতে ছাত্রলীগের মিছিলে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আলাউদ্দিনকে গ্রেপ্তার (দৈনিক আজাদী, ৯ আগস্ট) এবং ফেনীতে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খায়রুল বাশার তপনের কারাগারে যাওয়া (বাংলা ট্রিবিউন, ১০ আগস্ট)–এই দুই ঘটনাকে পুলিশের ‘টপ থ্রি’ সফলতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো অবশ্য প্রশ্ন তুলছে, সংগঠন নিষিদ্ধ থাকলেও ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অধিকার কি পুরোপুরি স্থগিত করা যেতে পারে? টিআইবি-র সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক নেতাদের ওপর দমন-পীড়নের প্রতিটি ঘটনা আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছ হতে হবে।
প্রতিক্রিয়া
হৃদয় হাসানের পরিবার দাবি করেছে, তিনি ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় নন। তাঁর বড় ভাই আবু সাঈদ বলেন, “মিরপুরের মিছিলের দিন হৃদয় অফিসে ছিল, ভিডিওতে যাকে দেখানো হয়েছে তা মনগড়া।” অন্যদিকে, সরিষাবাড়ী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, “হৃদয় দীর্ঘদিন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তবে নিষেধাজ্ঞার পর সে কোনো রাজনৈতিক কাজ করছে বলে জানি না।”
ডিএমপি–র উপকমিশনার (সিটিটিসি) মোহাম্মদ আসলাম খান বলেন, “ভিডিও, গোয়েন্দা তথ্য ও ডিজিটাল প্রমাণ হাতে আছে। গ্রেপ্তার সম্পূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ায় হয়েছে।” সামাজিক মাধ্যমেও গ্রেপ্তার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে—কেউ বাহবা দিচ্ছেন, কেউ বলছেন ‘ভাবমূর্তি রক্ষার অভিযান’।
এরপর কী
পুলিশ জানিয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২) ধারায় হৃদয়ের বিরুদ্ধে মামলার খসড়া প্রস্তুত, সোমবার আদালতে রিমান্ড আবেদনের পরিকল্পনা আছে। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, “মিরপুরের ঘটনার নেপথ্যে আর কারা ছিলেন, তা জানতে জিজ্ঞাসাবাদ জরুরি।”
আইন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ সাহেদের মতে, “ধারণা করা হচ্ছে, যাঁরা নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ব্যানারে রাস্তায় নামছেন, তাঁরা সবাই বিচ্ছিন্ন গ্রুপ; তবে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের কার্যকলাপ জননিরাপত্তার জন্য হুমকি।”
আগামী সপ্তাহে সিটিটিসি ও মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ যৌথ ব্রিফিংয়ে আরও অভিযানের তথ্য জানাতে পারে। অর্থাৎ ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা অবস্থায় যেকোনো গোপন মিছিল-সমাবেশের দায়ে আরও গ্রেপ্তার দেখার সম্ভাবনা প্রবল।

