আপিল বিভাগে ‘নো অর্ডার’, ব্লগার অভিজিৎ হত্যা মামলায় দণ্ডিত ফারাবীর জামিন বহাল
ঢাকা, ২০ আগস্ট: ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত শফিউর রহমান ফারাবীর অন্তর্বর্তীকালীন জামিন বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক। আজ রবিবার রাষ্ট্রপক্ষের জামিন স্থগিত চেয়ে করা আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে আদালত ‘নো অর্ডার’ یا কোনো আদেশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে গত ৩০ জুলাই হাইকোর্ট থেকে পাওয়া জামিনই কার্যকর থাকবে। রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সাইফুদ্দিন খালেদ ও আসামিপক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস এম শাহজাহান শুনানিতে অংশ নেন। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার টিএসসি এলাকায় নিহত হন যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়; ঘটনায় তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ গুরুতর আহত হন। ২০২১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ফারাবীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। শাস্তির বিরুদ্ধে তিনি আপিল করলে হাইকোর্ট শুনানির জন্য আবেদন গ্রহণ করে এবং বিচারাধীন অবস্থায় জামিন মঞ্জুর করে।
ঘটনাপ্রবাহ
চেম্বার আদালতে আজকের শুনানি ছিল মূলত ফারাবীর জামিন স্থগিতের আবেদনের বিষয়ে। রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি দেখায়, একটি আলোচিত হত্যা মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তি মুক্ত থাকলে বিচারকাজে প্রভাব পড়তে পারে। পাল্টা যুক্তিতে আসামিপক্ষ বলে, চার্জশিটে থাকা চারজনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি কোথাও ফারাবীর নাম নেই এবং তিনি ১৬৪ ধারায় কোনোকিছু স্বীকারও করেননি; তদন্তেও সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে বিচারপতি ‘নো অর্ডার’ ঘোষণার মাধ্যমে হাইকোর্টের জামিনাদেশ বহাল রাখেন।
প্রেক্ষাপট
২০১৫ সালে বইমেলা চলাকালে টিএসসি এলাকায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তচিন্তার লেখক অভিজিৎ রায়কে, যিনি অনলাইনে ধর্মীয় উগ্রবাদ নিয়ে সমালোচনামূলক লেখালেখির জন্য পরিচিত ছিলেন। বাবা অধ্যাপক অজয় রায় শাহবাগ থানায় মামলা করেন। তদন্তের চার বছর পর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিষিদ্ধ জঙ্গিগোষ্ঠী আনসার আল ইসলামের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা পড়ে। ২০২১ সালে রায়ে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড ও ফারাবীর যাবজ্জীবন হয়। বাকিদের অনেকে এখনো পলাতক।
প্রতিক্রিয়া
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সাইফুদ্দিন খালেদ বলেন, ‘হত্যার মতো গুরুতর মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কেউ জামিনে থাকলে সাক্ষীরা ভয় পেতে পারে।’ অন্যদিকে ফারাবীর আইনজীবী এস এম শাহজাহান প্রথম আলোকে জানান, ‘এ মামলায় প্ররোচনার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ নেই; আদালত তাই জামিন বহাল রেখেছেন।’ অভিজিৎ রায়ের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, তবে তারা আগে থেকেই দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি ও পলাতকদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছেন।
বিশ্লেষণ
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জামিন বহাল থাকলেও ফারাবী পূর্ণ স্বাধীন নন; হাইকোর্ট যেকোনো শর্ত আরোপ করতে পারে এবং আপিল মীমাংসিত না হওয়া পর্যন্ত সাজা বাতিল হয় না। একই সঙ্গে মামলাটি উচ্চ আদালতে দীর্ঘমেয়াদি থাকা স্বাধীন মতপ্রকাশ ও জঙ্গিবাদ দমনের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে বিচার ব্যবস্থার দক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এরপর কী
হাইকোর্টে ফারাবীর আপিল এখন মূল শুনানির তালিকায় রয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে আপিল বিভাগের পূর্ণ বেঞ্চে জামিন প্রশ্নে পুনরায় শুনানি হতে পারে। পাশাপাশি পলাতক চার আসামিকে ধরতে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে ভুক্তভোগী পরিবার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করা মহলগুলোর ‘বিচার বিলম্ব’ নিয়ে উদ্বেগ বাড়বে।
বৃহত্তর চিত্র
গত এক দশকে মুক্তচিন্তার লেখক, ব্লগার ও প্রকাশকের উপর ধারাবাহিক হামলা বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা পরিবেশকে বিপদে ফেলেছে। তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করে। ফারাবীর জামিনকে অনেকে ব্যক্তিগত অধিকার হিসেবে দেখলেও, অন্যরা এটিকে সহিংস উগ্রবাদ দমনে রাষ্ট্রের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন হিসেবে তুলছেন। যে পথেই এগোক, মামলাটির চূড়ান্ত রায় এবং পলাতকদের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের আইনি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতার পরীক্ষাকেই সামনে আনবে।
শেষ কথা
চেম্বার আদালতের ‘নো অর্ডার’ তাত্ক্ষণিকভাবে ফারাবীকে কারাগারের বাইরে রাখলেও হত্যার মূল বিচারের গতি ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। দ্রুত আপিল নিষ্পত্তি, পলাতকদের গ্রেপ্তার এবং সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে অবিশ্বাস ও ভয় দুটিই বাড়তে পারে।

