ডিসেম্বরের আগে চার কনটেইনার টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর আনতে চায় সরকার
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং, লালদিয়া ও বে টার্মিনালের অপারেশন বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার কার্যক্রম বছরের শেষ দিন, ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করতে চায় সরকার। রোববার বন্দরের ৪ নম্বর ফটকে নতুন ‘ইউজার সার্ভিস ডেস্ক’ উদ্বোধনের পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, অস্থায়ীভাবে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চালাচ্ছে, সেখানে এক মাসেই কনটেইনার ওঠানামা ৩০ শতাংশ বেড়েছে এবং খালাসে সময় কমেছে ১৩ শতাংশ। স্থায়ী অপারেটর হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড, নেদারল্যান্ডসের এপিএম টার্মিনালস ও সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনালকে নির্বাচন প্রায় চূড়ান্ত। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক শূন্যতায় যাতে কাজ স্থগিত না হয়, সেজন্যই দ্রুত চুক্তি সইয়ের টার্গেট নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রেক্ষাপট
গত আগস্টে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনাল বেসরকারি ব্যবস্থাপনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। প্রস্তাবে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের কার্যক্রম সরাসরি পরিচালনা, লালদিয়া ও বে টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণ–পরিচালনা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। সরকারি সূত্রে ‘প্রথম আলো’ জানায়, নিউমুরিংয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড, লালদিয়ায় এপিএম টার্মিনালস এবং বে টার্মিনালের দুই সাব-পোর্টে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সিঙ্গাপুরের পিএসএ সামনে এসেছে। লালদিয়া ও বে টার্মিনালের জমি ভরাট ও ব্রেকওয়াটারসহ প্রাথমিক কাজ প্রায় শেষ; পূর্ণাঙ্গ অবকাঠামো গড়তে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বিনিয়োগ লাগবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাব। আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর আনার পাশাপাশি বন্দরে এক ক্লিক সেবা, অটোমেশন ও ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও বলেছেন আশিক চৌধুরী।
এর গুরুত্ব কী
দেশের মোট আমদানি–রপ্তানির ৯০ শতাংশের বেশি পণ্য এখনো চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে যায়। পণ্য ওঠানামায় বিলম্ব হওয়ায় ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত জাহাজভাড়া ও ‘ডেমারেজ’ দিতে হয়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তা ও রপ্তানিকারকের খরচ বাড়ায়। সরকার বলছে, বিদেশি অপারেটর এলে শিপ টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম কমবে, খরচও কমবে। আন্তর্জাতিক শিপিং র্যাঙ্কিংয়ে যেখানে ভিয়েতনামের হাইফং বন্দর বাংলাদেশ থেকে তিন ধাপ এগিয়ে, ২০৩০ সালের মধ্যে সেখানে চট্টগ্রামকে ‘শীর্ষ স্তরে’ তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি সফল হলে তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত মাছসহ প্রধান রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে দেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ২০২৩–২৪ অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং: ১৩ লাখ ইউনিট (TEU)
• সিডিডিএল নেওয়ার পর মাসিক হ্যান্ডলিং বৃদ্ধির হার: ৩০%
• পণ্য খালাসের গড় সময় সংকোচন: ১৩%
• ২০২5 সালের লক্ষ্য: ১৭ লাখ TEU
• ২০৩০ সালের প্রকল্পমান সক্ষমতা: বর্তমানের চেয়ে ৪–৫ গুণ বেশি
• সম্ভাব্য বৈদেশিক বিনিয়োগ: প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার
প্রতিক্রিয়া
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বলেন, ‘সিডিডিএল প্রমাণ করেছে যে সঠিক ব্যবস্থাপনা দিলে উৎপাদনশীলতা দ্রুত বাড়ে। আন্তর্জাতিক অপারেটর এলে ওই ধারা আরও তরান্বিত হবে।’ তবে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাক-ট্রেলর শ্রমিক ইউনিয়নের এক নেতার শঙ্কা, ‘বিদেশি অপারেটর কর্মী ছাঁটাই করতে পারে, সে জন্য স্বার্থ সংরক্ষণের মেকানিজম দরকার।’ বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক আকবর ‘রয়টার্সকে’ বলেন, ‘অনিশ্চিত রাজনীতি সামনে রেখে দ্রুত চুক্তি স্বস্তি দিচ্ছে, তবে ট্যারিফ নীতি স্বচ্ছ থাকতে হবে।’ স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন সিবিআইএ জানায়, ডিজিটালাইজেশন কার্যকর হলে অফডক-কনটেইনার ট্রান্সফারও সহজ হবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
বন্দর কর্তৃপক্ষ অক্টোবরের মধ্যে নেগশিয়েশন শেষ করে নভেম্বরেই চুক্তির খসড়া মন্ত্রিপরিষদে তুলতে চায়। অনুমোদন পেলে ডিসেম্বরে সই ও ‘ট্রানজিশন টিম’ গঠন করা হবে। নিউমুরিংয়ে ২০২৬ সালের শুরুতেই পূর্ণ দায়িত্ব নেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। লালদিয়া ও বে টার্মিনালের নির্মাণে ৩–৪ বছর লাগবে, তাই ‘ডিজাইন–বিল্ড–অপারেট’ মডেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ড্রেজিং ও জেটি নির্মাণ শুরু হবে। আগামী জাতীয় নির্বাচন ও সরকার গঠন পর্বে যাতে সিদ্ধান্ত বদল না হয়, সে জন্য বন্দর আইন অনুসারে ৩০ বছরের কনসেশন, নির্দিষ্ট কর্মসম্পাদন সূচক (KPI) ও ঝুঁকি ভাগাভাগি চুক্তিতে সুরক্ষা ধারা রাখা হচ্ছে বলে বন্দর সূত্র জানায়।

