বিনিয়োগ টানতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল নীতি চাই: সিপিডি সংলাপে বক্তারা
রাজধানীর এক হোটেলে রোববার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের ৩৬৫ দিন’ শীর্ষক সংলাপে ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও রাজনীতিবিদেরা বলেছেন, ঘন ঘন নীতি বদল ও ব্যাংক খাতের অনিয়ম বিনিয়োগের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল ও ব্যবসাবান্ধব নীতিমালা এবং প্রশাসনিক জটিলতা কমানোর সুপারিশ করেন। শ্রম উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, বিএনপির আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিজিএমইএ ও বিটিএমএর প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন। বক্তারা বলেন, আর্থিক খাতে কিছু সংস্কার দেখা গেলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল শাসনব্যবস্থার কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না।
পটভূমি
গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আশ্বাস দিয়েছিল অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে। এক বছর পূর্তিতে সেই অগ্রগতি পর্যালোচনায় সিপিডি এ সংলাপের আয়োজন করে। মূল প্রবন্ধে নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন দেখান, ৩৮টি সংস্কার অঙ্গীকারের মধ্যে মাত্র ৯টিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি, ১১টিতে প্রায় শূন্য, বাকিগুলো অপূর্ণ। বিশেষত ব্যাংকিং খাত, কর আহরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাস্তব অগ্রগতি কম।
প্রতিক্রিয়া
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘চুরি করা ব্যাংকগুলো বাঁচাতে গিয়ে ভালো উদ্যোক্তাদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে।’ বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, সদস্য কারখানা ৭,২০০ থেকে সঙ্কুচিত হয়ে ৩,০০০-এ নেমেছে, যার জন্য তিনি ‘প্রতিনিয়ত নীতি বদলের ধাক্কা’কে দায়ী করেন। বিএনপির আমীর খসরু বলেন, একটি রেস্তোরাঁ খুলতেও ১৯টি লাইসেন্স লাগে—এ ধরনের আমলাতান্ত্রিকতা বিনিয়োগে প্রধান বাধা। অপর দিকে শ্রম উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন দাবি করেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি গত বছরের চেয়ে ভালো, তবে মাস্তানতন্ত্র ও দুর্নীতির শিকড় কাটেনি।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সতর্ক করেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত না হলে আর্থিক খাতের সংস্কারও দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অর্থনীতিবিদেরা বলেন, শুল্ক ও কর কাঠামো যেন ৩-৫ বছর অপরিবর্তিত থাকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বস্তি মানে বাজারের স্বস্তি—এই নীতিগত বার্তা ব্যবসায়ীদের জরুরি। সিপিডির মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ‘একটি সুন্দর বাজেট ঘোষণার পর বছর ঘুরতেই যখন বেশির ভাগ শুল্কহার বদলে যায়, তখন বিনিয়োগকারী হিসাব-নিকাশ করতে পারেন না।’ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের নজরও একই দিকে; কনফিডেন্স স্থির না থাকলে এফডিআই আসার সম্ভাবনা কম।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• ২০২৫ অর্থবছরে সরকার-প্রত্যাশিত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও কর-জিডিপি অনুপাত দুইই কমেছে।
• ১৬ ব্যাংক ও ৭ আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে একটি গোষ্ঠীর ঋণ আত্মসাতের পরিমাণ ৪৮,০০০ কোটি টাকা—সংলাপে শ্রম উপদেষ্টা।
• বিজিএমইএর সক্রিয় কারখানার সংখ্যা ১০ বছরে ৭,২০০ থেকে ৩,০০০-এ নেমেছে।
• একটি রেস্তোরাঁ খুলতে প্রয়োজন লাইসেন্স: ১৯টি।
এরপর কী
বক্তারা তিন দফা সুপারিশ দিয়েছেন: (১) নীতি-বদলের আগে পর্যাপ্ত রোডম্যাপ ও কমপক্ষে তিন বছরের স্থায়িত্ব নিশ্চয়তা; (২) ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক এবং মালিকানার স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ আদায়ে সময়সীমা; (৩) বাণিজ্যিক অনুমোদন ও ট্যাক্স রিফান্ডসহ সব প্রশাসনিক সেবা ডিজিটাল ও ‘ওয়ান-স্টপ’ পদ্ধতিতে নেওয়া। সিপিডি মনে করে, এ উদ্যোগগুলো আগামী বাজেট ঘোষণার আগেই শুরু হলে বিনিয়োগ আস্থার সোনার হরিণ আবার ধরা দিতে পারে।

