মালয়েশিয়া সফরে প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস: জনশক্তি রপ্তানি ও বিনিয়োগ বাড়াতে একগুচ্ছ সমঝোতা
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সোমবার ১১-১৩ আগস্টের তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে কুয়ালালামপুর যাচ্ছেন। ঢাকায় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রেস ব্রিফিংয়ে তাঁর প্রেস সচিব জানিয়েছেন, আলোচনার প্রধান দুটি ইস্যু হচ্ছে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার নিয়ম শিথিল করা এবং মালয়েশিয়ার সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে নতুন বিনিয়োগ টানা। সফরে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি-সহ অন্তত সাতটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। ইউনূসের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, নিরাপত্তা ও ব্যবসায়ী নেতারা রয়েছেন। ১২ আগস্ট পুত্রজায়ায় ইউনূস ও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চূড়ান্ত হবে চুক্তিগুলো। সফর শেষ দিনে ইউকেএম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিগ্রি দেবে।
পটভূমি
মালয়েশিয়া ১৯৯০-এর দশক থেকেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ বাংলাদেশি কর্মী সে দেশে কাজ করেন এবং বছরে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার কোম্পানি-গোষ্ঠী সিমেডারবি, পেট্রোনাস ও টেলিকম মালয়েশিয়া ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ, এলএনজি ও টেলিকম খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। গত অক্টোবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ঢাকা সফর করার পর দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক উষ্ণ হয়েছে, এবারের সফরকে সেই ধারাবাহিকতার পরবর্তী ধাপ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এর গুরুত্ব কী
বাংলাদেশের বেকার যুবকদের জন্য মালয়েশিয়া স্থায়ী ও স্বল্পখরচে কর্মসংস্থানের অন্যতম গন্তব্য। চলতি অর্থবছরে বিশাল রেমিট্যান্স ঘাটতি দেখা দিয়েছে; ফলে নতুন কোটায় কর্মী প্রেরণ করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ প্রশস্ত হবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দর, এলএনজি টার্মিনাল ও আধুনিক চিপ উৎপাদনে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা আছে, যেগুলো দেশের অবকাঠামো ও রপ্তানি বৈচিত্র্যে সহায়ক হতে পারে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি দুই দেশের যৌথ মহড়া ও প্রশিক্ষণ বাড়াবে, যা বঙ্গোপসাগর ও মালাক্কা প্রণালি ঘিরে সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ঘটনাপ্রবাহ
• ১১ আগস্ট: ইউনূসকে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার দিয়ে স্বাগত জানাবেন মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুসন।
• একই দিন: মালয়েশিয়ার শীর্ষ করপোরেট গ্রুপের সিইওদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক।
• ১২ আগস্ট: পুত্রজায়ায় প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত ও প্রতিনিধি পর্যায়ে বৈঠক, পরে সাতটি সমঝোতা স্মারক সই—এর মধ্যে আছে প্রতিরক্ষা, এলএনজি সরবরাহ, হালাল ইকোসিস্টেম, ফরেন সার্ভিস একাডেমি ও উচ্চশিক্ষা।
• সন্ধ্যায় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বিজনেস কনফারেন্স; এফবিসিসিআই ও মালয়েশিয়া চেম্বারের মধ্যে কর্পোরেট সহযোগিতা চুক্তি।
• ১৩ আগস্ট: মালয়েশিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (ইউকেএম) ইউনূসকে ‘ডক্টরেট অব লজ’ উপাধি প্রদান; বিকেলে ঢাকায় ফেরা।
বিশ্লেষণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে রিক্রুটিং এজেন্সি-নির্ভরতা কমিয়ে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) পদ্ধতি জোরদারের ঘোষণা আসতে পারে, যা কর্মী প্রত্যাশীদের খরচ ৪-৫ গুণ কমাবে। বিনিয়োগ অংশে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত তেলগ্যাস কোম্পানি পেট্রোনাস চট্টগ্রামে এলএনজি স্টোরেজ ও রি-গ্যাসিফিকেশন প্রকল্পে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে; সফল হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়বে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, যেকোনো সমঝোতার বাস্তবায়নে بيرোক্রেটিক জট ও ভূমি অধিগ্রহণ বাংলাদেশের বড় বাঁধা।
পরবর্তী পদক্ষেপ
সফর শেষে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিটি সমঝোতা স্মারকের কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন হবে। জনশক্তি মন্ত্রণালয় একটি ‘ডিজিটাল ওয়ার্ক পারমিট পোর্টাল’ চালু করবে, যাতে মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতারা সরাসরি ডাটাবেস থেকে কর্মী বাছাই করতে পারেন। বাণিজ্য অংশে বিডা ও মালয়েশিয়ার ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এমআইডিএ) যৌথভাবে ঢাকা-কুয়ালালামপুর ‘বিনিয়োগ সেতু’ চালু করবে। অক্টোবরের মধ্যে ঢাকায় যৌথ বাণিজ্য কমিশনের বৈঠকে অগ্রগতি পর্যালোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

