ঢাকার বাসস্টপে যাত্রী ধরতে সহকারীদের টানাহেঁচড়া, নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতায় ভোগান্তি বাড়ছে

ঢাকার বাসস্টপে যাত্রী ধরতে সহকারীদের টানাহেঁচড়া, নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতায় ভোগান্তি বাড়ছে

ঢাকার বিভিন্ন বাসস্টপে গত কয়েক দিন ধরে যাত্রী ধরার নামে সহকারীদের (হেলপারের) টানাহেঁচড়ার ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাথমিক সূত্র প্রথম আলোর একটি ফটো রিপোর্ট, যেখানে দেখা যায়—এক নারী কোলে থাকা শিশুকে ধরে টেনে বাসে তুলছেন সহকারী, আরেকজন একই সময়ে যাত্রীর দুই হাত ধরে টানছেন অন্য বাসে নিতে। রাজধানীর গাবতলী, মিরপুর, মহাখালী, যাত্রাবাড়ীসহ অধিকাংশ স্টপেজেই দৃশ্যটি এখন নিত্যদিনের; সময় সকাল-বিকেল পিক আওয়ারে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়। অনিয়ন্ত্রিত পরিবহন ব্যবসা, কমিশন নির্ভর আয় ও পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবকে এর মূল কারণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। আইন অনুযায়ী যাত্রীকে জোর করে বাসে তোলা দণ্ডনীয় অপরাধ হলেও বাস্তবে কঠোর ব্যবস্থা চোখে পড়ে না, ফলে যাত্রীরা নিরাপত্তাহীনতা ও শারীরিক ঝুঁকিতে পড়ছেন।

প্রেক্ষাপট

ঢাকায় নিবন্ধিত বড় বাস প্রায় আট হাজার, মিনিবাস ও কোচ মিলিয়ে এর সংখ্যা সাড়ে বারো হাজারের বেশি (BRTA, ২০২২)। অধিকাংশ বাসের সহকারীরা প্রতিটি যাত্রীর জন্য নির্দিষ্ট কমিশন পান; ফলে স্টপেজে এক বাসের সঙ্গে আরেক বাসের যাত্রী ছিনিয়ে নেওয়ার "আধা-শারীরিক" প্রতিযোগিতা গড়ে উঠেছে। কোভিডের পর থেকে যাত্রী কমে যাওয়া, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি ও চালকদের বেতন বাড়ায় মালিকেরা কমিশন নির্ভর মডেলকে আরও চাপিয়ে দেন বলে পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের কয়েকজন কর্মী স্বীকার করেছেন। ফলে পথচারী, নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের ওপর জোরাজুরির ঘটনা বাড়ছে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• প্রতিদিন প্রায় ৩৫ লাখ মানুষ ঢাকা শহরে বাসে চলাচল করেন (DTCA সমীক্ষা, ২০২১)।

• ২০২২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৫৪৪০ জনের মৃত্যু; এর ৩০ শতাংশের সঙ্গে বাস関, Road Safety Foundation জানায়।

• বর্তমান মোট পরিবহন মামলা (হ্যারাসমেন্ট, ওভারচার্জিং, রুট ভঙ্গ) ২০২২ সালে ছিল ৪১,০০০টি; শাস্তি হিসেবে লাইসেন্স স্থগিত হয় মাত্র ৯৪৯টি (ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ)।

• ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন ৯৬(১) ধারা অনুযায়ী যাত্রীকে জোরপূর্বক বাসে তোলা ও হয়রানি করলে সর্বোচ্চ ছয় মাস জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে; বাস্তবে এ ধরনের সাজা নজরে পড়ে না।

প্রতিক্রিয়া

মিরপুর ১০ নম্বর স্টপেজে অপেক্ষমাণ ব্যাংককর্মী রাশেদা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, "এক হাত দিয়ে ব্যাগ, অন্য হাতে বাচ্চাকে ধরে থাকতে হয়। বাসের ছেলেরা টেনে ধরে উঠাতে গেলে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। অনেক সময় বাসে উঠতেই হয় অপদস্ত হয়ে।" পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যা however দাবি করেন, "কিছু অপেশাদার গাড়ি সহকারী এমন কাজ করে। আমরা নিয়মিত সতর্ক করছি, অথচ যাত্রীও দ্রুত উঠতে চান—দুটো মিলে সমস্যা হয়।" ঢাকা মহানগর ট্রাফিক (উত্তর) বিভাগের উপকমিশনার মো. সৈয়দ আলী জানান, "স্টপেজে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। অভিযোগ পেলে সঙ্গে সঙ্গে মামলা ও জরিমানা করা হয়। তবে জনবল সীমিত হওয়ায় সব জায়গায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা সম্ভব হয় না।"

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, "যাত্রী ধরার এই ঔদ্ধত্য মূলত ধীরগতির বাস-রুট-রেশনালাইজেশন (BRR) প্রকল্পের ফল। একক কোম্পানি ভিত্তিক গাড়ি চালু না করে যখন ১০–১৫টি কোম্পানি একই রুটে বিক্ষিপ্তভাবে চলবে, তখন প্রতিযোগিতা গিয়ে গায়ের শক্তিতে নামে।" যাত্রীপথ নিরাপত্তা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ সেফরোডের আহ্বায়ক মালিহা তাসনিম যোগ করেন, "শিশু ও নারী যাত্রীদের টানাহেঁচড়ার মধ্যে যৌন হয়রানির ঝুঁকিও লুকিয়ে আছে, যেটা প্রায়ই রিপোর্টই হয় না।"

এরপর কী

সিটি করপোরেশন ও DTCA ইতিমধ্যে আটটি রুটে গ্রীন-লাভ বাস সার্ভিসে একক টিকিটিং চালুর পাইলট শুরু করেছে। পরিকল্পনা সফল হলে ২০২৫ সালের মধ্যে পুরো নগরীকে চারটি করিডরে ভাগ করে কোম্পানি ভিত্তিক বাস চালু করার লক্ষ্য রয়েছে, যাতে হেলপারদের কমিশন মডেল বন্ধ করা যাবে। এ ছাড়া ডিজিটাল পেমেন্ট ও নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যাত্রী ওঠা-নামা নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। পরিবহন বিশ্লেষকেরা মনে করেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মালিক–শ্রমিকের উপার্জন কাঠামো বদলানোই দীর্ঘমেয়াদে টানাহেঁচড়া বন্ধের প্রধান উপায়।

শেষ কথা

রাজধানীর সড়কে বাস সহকারীদের হাতে যাত্রী নিগ্রহ নতুন কিছু নয়, কিন্তু সম্প্রতি দৃশ্যমান হওয়া টানাহেঁচড়ার ছবি আর ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ বাড়িয়ে দিয়েছে। জননিরাপত্তা, নারীর চলাচলস্বাধীনতা ও সড়ক শৃঙ্খলা—সব দিক থেকেই এ ঘটনা এক নতুন সতর্ক সংকেত। নিয়ন্ত্রক সংস্থার তৎপরতা আর নীতিগত সংস্কার যদি দ্রুত না আসে, তাহলে ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও হ্রাস পাবে, যা শেষ পর্যন্ত নাগরিক জীবন ও অর্থনীতির উপরই চাপ বাড়াবে।

More From Author

‘প্রহসনমূলক’ জুলাই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করল ৬০ ছাত্রনেতা, গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি

ঢাবি হলে রাজনীতির ভবিষ্যৎ ঢাকায় জটিল আলোচনায়ই আটকে রইল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *