‘প্রহসনমূলক’ জুলাই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করল ৬০ ছাত্রনেতা, গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি

‘প্রহসনমূলক’ জুলাই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করল ৬০ ছাত্রনেতা, গণপরিষদ নির্বাচনের দাবি

রবিবার রাত (১০ আগস্ট) ঢাকায় এক যৌথ বিবৃতিতে চব্বিশের ইতিহাসখ্যাত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত ৬০ জন ছাত্রনেতা তথাকথিত ‘জুলাই ঘোষণা’কে জনগণের সঙ্গে প্রতারণামূলক প্রহসন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের ভাষায়, ৫ আগস্ট বিপ্লবের রক্তের বিনিময়ে গড়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশের সঙ্গে ওই ঘোষণার কোনও সাংগঠনিক সামঞ্জস্য নেই। নেতারা অবিলম্বে সর্বশ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে গণপরিষদ নির্বাচন, এরপর প্রকৃত গণবান্ধব সংবিধান প্রণয়ন এবং শহীদ-আহতদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পুনর্বাসনের দাবি জানান।

বিবৃতিতে জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকা, কুমিল্লা, খুলনা, জগন্নাথসহ বিভিন্ন পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সই করেন। ঘোষণাটি আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন মহল, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সংগঠন ভিন্নমত ও সমর্থন—উভয়ই প্রকাশ করেছে।

পটভূমি

৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এর পরের সপ্তাহেই ‘জুলাই ঘোষণা’ শীর্ষক একটি দলিল জনসমক্ষে আসে, যাতে পুরোনো প্রশাসন, পুলিশ-ব্যবস্থা ও প্রচলিত সংবিধানকে আংশিক রেখে সংস্কার কর্মসূচির রূপরেখা দেওয়া হয়। বহু আন্দোলনকর্মীই শুরু থেকেই দলিলটিকে ‘সিস্টেম রক্ষণশীল’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন। রবিবারের ছাত্রনেতাদের বিবৃতি সেই বিরোধিতাকে সংগঠিত অবস্থানে নিয়ে গেল।

প্রতিক্রিয়া

• নুরুল হক নূর (গণ অধিকার পরিষদ) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বলেন, ‘রাজনীতির আকাশে এখনও মেঘ জমে আছে, প্রতারণামূলক কোনও সমঝোতা মানুষ মেনে নেবে না।’

• জাতীয় পার্টির নবনির্বাচিত মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার গণমাধ্যমকে জানান, ‘সবার অংশগ্রহণে অবাধ ভোট না হলে স্থায়ী শান্তি আসবে না।’

• জামায়াত নেতা এ এম তাহের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত না হলে মানুষ ভোটকেন্দ্রে যাবে না।’

• নারী সংগঠক শারমীন মুরশিদ অভিযোগ করেন, “নারীবিহীন কমিশন নারী বিষয় ঠিক করছে—এটা অনভিপ্রেত।”

• ধর্ম উপদেষ্টা খালিদ হোসেন অবশ্য দাবি করেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা ও অর্থনীতি আগের চেয়ে অনেক ভালো, ফেব্রুয়ারিতে সুন্দর নির্বাচন সম্ভব।’

বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছাত্রদের বিবৃতি একদিকে যুব-সমাজের হতাশা ও প্রত্যাশা দুইই প্রকাশ করে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ বাড়ায়। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় পর্বে বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ও মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীরা ফ্রন্টলাইন গঠন করেছিল; সেই শক্তি যদি আবার সংগঠিত হয়, তবে ঘোষিত ফেব্রুয়ারি নির্বাচন প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। অন্য আরেকটি ধারা—জাতীয় ঐকমত্য কমিশন—আইনি কাঠামো খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞ বৈঠক শুরু করেছে, যা দ্বৈত চাপ সৃষ্টি করছে: একদিকে ‘প্রকৃত সংবিধান’-এর দাবি, অন্যদিকে দ্রুত নির্বাচন।

এরপর কী

বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীরা ১৫ অগস্টের মধ্যে—শহীদ ও আহতদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ, চিকিৎসা-পুনর্বাসন প্যাকেজ এবং ‘প্রতারণামূলক দলিল’ বাতিলের টাইমলাইন দিতে সরকারের প্রতি আল্টিমেটাম দিয়েছেন। তারা ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় দেশব্যাপী শিক্ষার্থী-কৃষক-শ্রমিক সমাবেশ ডাকার কথাও জানান। সরকারপক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও আইনমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, ‘গণপরিষদ নির্বাচন হলে তা ফেব্রুয়ারি ভোটের পরেই বিবেচ্য’। পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, দুই পক্ষ সমঝোতায় না পৌঁছালে আবারও রাস্তায় উত্তেজনা বাড়তে পারে।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

৬০ – যৌথ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করা বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা-ভিত্তিক ছাত্রনেতা

১৪০০+ – জাতিসংঘের অনুযায়ী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত শহীদ

২০,000+ – আহত, যাদের মধ্যে অন্তত ৫০০ জন স্থায়ী দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন

৫০ – এখনো অপরিবর্তিত সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা (কমিশন প্রস্তাব)

৫ % – আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বড় দলগুলোর নারীমনোনয়নের সর্বনিম্ন অঙ্গীকার

১ মার্চ – অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত নতুন সংবিধান খসড়া প্রকাশের টার্গেট তারিখ

More From Author

অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়া সিরিজই কি কোহলি-রোহিতের শেষ ওডিআই?

ঢাকার বাসস্টপে যাত্রী ধরতে সহকারীদের টানাহেঁচড়া, নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতায় ভোগান্তি বাড়ছে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *