রাজনৈতিক চাপমুক্ত স্বাধীন ‘পরিসংখ্যান কমিশন’ গঠনের দাবি জোরাল, দিশাহারা নীতি-নির্ধারণে তথ্যের সংকট

রাজনৈতিক চাপমুক্ত স্বাধীন ‘পরিসংখ্যান কমিশন’ গঠনের দাবি জোরাল, দিশাহারা নীতি-নির্ধারণে তথ্যের সংকট

দেশের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর ৪ হাজার ৩৫৮ জন কর্মীর মধ্যে ৪ হাজার ১৮৮ জন—অর্থাৎ প্রায় ৯৬ শতাংশ—একটু আগে প্রকাশিত এক অভ্যন্তরীণ বিবৃতিতে সংস্থাটিকে ‘স্বাধীন পরিসংখ্যান কমিশনে’ রূপান্তরের দাবি তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, আগের সরকার অর্থনৈতিক সাফল্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখাতে মাথাপিছু আয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি সহ নানা সূচকে হস্তক্ষেপ করেছিল, যা নীতিনির্ধারণের মৌলিক উপাদানের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। একই সঙ্গে সরকারের গঠিত অর্থনীতিসংক্রান্ত শ্বেতপত্র কমিটি ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনও বিবিএসকে জাতীয় সংসদ-নির্ভর, স্বয়ংক্রিয় নিয়োগক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন করার সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে। ফলে পরিসংখ্যান ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে।

প্রেক্ষাপট

১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিবিএস জনমিতি, শ্রমশক্তি, কৃষি, শিল্প, দারিদ্র্যসহ ৩০-এর বেশি বিষয়ে জরিপ চালিয়ে থাকে। কিন্তু বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচক সরকারের রাজনৈতিক বিবেচনায় ‘ঘষামাজা’ করার অভিযোগ বহুদিনের। সম্প্রতি সাবেক ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর সংস্থার ভেতর থেকেই চাপ আসছে ‘ডেটা-ক্যাপচার’ বন্ধ করার। কর্মীরা বলছেন, রাজনৈতিক হাকিমি আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না করলে সংগৃহীত তথ্য জনবিশ্বাস ফিরে পাবে না এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাও বারবার আঁধারে পড়বে।

এর গুরুত্ব কী

বিশ্বব্যাপী কৌলিন্যধারী নীতিনির্ধারণ প্রথমেই ভর করে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর। অথচ বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ দেখিয়েছে, ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে দেশে বেকার ২৬ লাখ ৬০ হাজার—এক বছরে বেড়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার। পরিসংখ্যানের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি বা শিল্প উৎপাদনের আসল চিত্রও ঝাপসা থেকে যায়। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তথ্য-উপাত্তে আস্থা না থাকায় বিনিয়োগ পরিকল্পনা, সামাজিক সুরক্ষা বা রাজস্ব পূর্বাভাস—সবই এখন ‘ধোঁয়াসায়’। স্বাধীন কমিশন গড়ে তথ্যের নিরপেক্ষতা ফেরানো না গেলে এই অবস্থা আরও বাড়বে।

প্রতিক্রিয়া

বিবিএস কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক জিন্নাতুল ফেরদৌস বলেন, “আমাদের কাজ মাঠ থেকে শুরু করে বিশ্লেষণ পর্যন্ত—সবখানে রাজনৈতিক নির্দেশনা ঠেকানোর জন্য সাংগঠনিক স্বাধীনতা জরুরি।” পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, কমিশন গঠনের প্রস্তাবনীতি আগামী মন্ত্রিসভায় তোলা হবে, তবে “জবাবদিহির দুর্বলতা” নিয়েও ভাবতে হবে। অন্যদিকে বিরোধী দল জাতীয় সংসদে দাবি তুলেছে, আগের সব বিতর্কিত সূচক ‘রি-ভ্যালিডেশনের’ মাধ্যমে সংশোধন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক প্রথম আলোকে বলেন, “ডেটা বিকৃতি শুধু নৈতিক দুর্বলতা নয়, অর্থনীতিতেও সুস্পষ্ট ব্যর্থতা ডেকে আনে। কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির মতো সংকট বুঝতে নির্ভুল তথ্য লাগবে।” সাবেক প্রধান পরিসংখ্যানবিদ ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ মনে করেন, কমিশন হলে তথ্য সংগ্রহ থেকে প্রকাশ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট আইনি সময়রেখা নির্ধারিত হবে, যা হস্তক্ষেপ কমাবে। তবে “অভ্যন্তরীণ অডিট ও ইথিকস কমিটি” বাধ্যতামূলক করা না হলে স্বাধীনতা অপব্যবহারও সম্ভব, বলেন তিনি।

পরবর্তী পদক্ষেপ

জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন আগামী মাসের শুরুতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেবে। সেখানে কমিশন গঠনের আইনি রূপরেখা, নিজস্ব ক্যাডারভিত্তিক নিয়োগ, এবং সংসদীয় কমিটির ত্রৈমাসিক শুনানির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আইন পাস হতে হলে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই বিল উঠতে পারে। এগোলে ২০২5 সালের মাঝামাঝি নতুন পরিসংখ্যান কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। meanwhile, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় একটি ‘ডেটা ইনটেগ্রিটি টাস্কফোর্স’ গঠন করে বিদ্যমান জরিপগুলোর ফলাফল পুনর্মূল্যায়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

More From Author

যমুনাপাড়ের ভরসা মাত্র একটি বাঁশের সাঁকো, ১৫ বছরেও সেতু নেই

কুয়ালালামপুরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ফুটবল ফাইলে মালয়েশিয়ার বিডিএফসি ৩–০ গোলে জয়ী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *