লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ: স্বল্প বাক্যে আস্থার পরিপূর্ণ ঘোষণা
ইসলামের অন্যতম পরিচিত জিকির “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”-এর বাংলা মানে, “আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা ছাড়া কোনো শক্তি বা সামর্থ্য নেই।” কুরআন ও হাদিস-নির্ভর এ বাক্যটি মুমিনকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে দুঃসময়, উদ্বেগ বা গুরুত্বপূর্ণ কাজের আগে একমাত্র আল্লাহর ওপরই নির্ভর করা উচিত। ঢাকার ইসলামিক গবেষক মুফতি শফি উসমানীর ‘মা’আরিফুল কুরআন’ থেকে শুরু করে সহিহ বুখারি ও সুনান তিরমিজির হাদিস পর্যন্ত—সবখানেই এর ফজিলত উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা তা সকাল-সন্ধ্যা, নামাজের পর কিংবা হঠাৎ দুশ্চিন্তায় পড়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত এ জিকির পাঠ গুনাহ মাফ, মানসিক প্রশান্তি ও শয়তানি কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে আশ্রয় এনে দেয়। আধুনিক জীবনের চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশেও বেড়েছে এ জিকিরের চর্চা, যা ঈমান জাগ্রত করার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষায় আধ্যাত্মিক এক ‘মাইন্ডফুলনেস’ অনুশীলন হিসেবেও কাজ করছে।
পটভূমি
ইসলামের প্রথম দিক থেকেই খোলা দোয়া ও জিকিরের তালিকায় “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” আলাদা গুরুত্ব পায়। হাদিস শাস্ত্রে এটি ‘কানযুন মিন কুনূযিল জান্নাহ’—অর্থাৎ জান্নাতের গোপন ধন—হিসেবে বর্ণিত (সহিহ বুখারি ৪২০২)। অর্থ শুধু আল্লাহর সর্বশক্তির স্বীকৃতিই নয়, মানুষকে নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে শেখায়। নবী মোহাম্মদ (সা.) সাহাবাদের কঠিন পরিস্থিতি, যুদ্ধের ময়দান এমনকি দৈনন্দিন কর্মের শুরুতেও এ বাক্য উচ্চারণে উৎসাহ দিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম জানালেন, “এই জিকির আত্মসমর্পণের ভাষা। মনোযোগ সহকারে তিনবার পাঠ মানসিক চাপ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে—এ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাও হচ্ছে।” বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের খতিব মওলানা জামাল উদ্দিন বলেন, “শুধু মুখে নয়, হৃদয়ে বিশ্বাস রেখে উচ্চারণ করলেই গুনাহসমূহ মাফের প্রতিশ্রুতি রয়েছে।” মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. বিদ্যুৎ কুমার সাহা যুক্ত করলেন, “এ জিকিরকে আমি ‘স্পিরিচুয়াল ব্রেথিং এক্সারসাইজ’ বলি। নিয়মিত পাঠে হৃদস্পন্দন ধীর হয়, কর্টিসল কমে, যা উদ্বেগ কমায়।”
মূল তথ্য
• শব্দ সংখ্যা: ৮ (আরবি উচ্চারণে)
• অর্থ: “আল্লাহর শক্তি ছাড়া কোনো শক্তি নেই”
• হাদিসে উল্লিখিত পুরস্কার: জান্নাতের ধন, গুনাহ মাফ, শয়তানের কুমন্ত্রণার সুরক্ষা
• উপযোগী সময়: দুশ্চিন্তা, ভয়, কাজের শুরু, সকাল-সন্ধ্যা, ফরজ নামাজের পর
• তথ্যসূত্র: সহিহ বুখারি ৪২০২; সুনান তিরমিজি ৩৩৭১; মুফতি শফি উসমানীর ‘মা’আরিফুল কুরআন’ (৮/২৪৫, ২০১০ সংস্করণ); সাইয়্যিদ সাবিকের ‘ফিকহুস-সুন্নাহ’ (পৃষ্ঠা ২০৫, ২০১৮ সংস্করণ)
বৃহত্তর চিত্র
কোভিড-পরবর্তী সময়ে যখন মানসিক স্বাস্থ্যের চ্যালেঞ্জ বেড়েছে, তখন বাংলাদেশে ইউটিউব, ফেসবুক ও টিকটকে এ জিকিরসংক্রান্ত কনটেন্ট কয়েক কোটি বার দেখা হয়েছে—ডিজিটাল অ্যানালিটিক্স প্ল্যাটফর্ম ‘কিউলে’র তথ্য। ইসলামিক বক্তা মিজানুর রহমান আজহারীর এক লাইভ সেশনে এই বাক্যের আলোচনা ১১ লাখ ভিউ ছাড়ায়। এমন প্রবণতা প্রমাণ করে, তরুণ প্রজন্মও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির খোঁজে প্রযুক্তিই দ্বারস্থ হচ্ছে, আর জিকির তাদের ‘ডিজিটাল ডিটক্স’ হিসেবে কাজ করছে।
এরপর কী
ধর্মীয় গবেষকেরা পরামর্শ দেন, প্রতিদিন অন্তত এক মিনিট সময় বের করে গভীর মনোযোগে কয়েকবার ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ পাঠ করা যায়। মসজিদভিত্তিক খুতবায় বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করলে সাধারণ মানুষ নিয়মিত স্মরণে উৎসাহ পাবে। পাশাপাশি মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে ‘সাইলেন্ট জিকির ব্রেক’ চালুর প্রস্তাবও রয়েছে, যাতে পড়ুয়া ও কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে।

