আট উপদেষ্টার দুর্নীতি অভিযোগে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য: বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে উত্তাপ
রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে শুক্রবার এক সেমিনারে সাবেক সচিব ও বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এ-বি-এম আবদুস সাত্তার দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাদের কাছে ‘সীমাহীন দুর্নীতি’র প্রমাণ আছে। পরদিন শনিবার সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে বলেন, দল উপদেষ্টাদের সততা নিয়ে ‘পূর্ণ আস্থা’ রাখে এবং সাত্তারের মন্তব্য তার ‘ব্যক্তিগত’। একই দিন সরকারের প্রেস উইং থেকে পাঠানো পৃথক বিবৃতিতে অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ আখ্যা দিয়ে প্রমাণ পেশের আহ্বান জানানো হয়। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি বিবৃতি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—সত্যিই কি দুর্নীতির তথ্য আছে, নাকি এটি আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আরেক দফা দড়ি টানাটানি?
ঘটনাপ্রবাহ
৮২ ব্যাচের অবসরপ্রাপ্ত প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা এ-বি-এম আবদুস সাত্তার শুক্রবার দুপুরে আয়োজিত একটি সেমিনারে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনের রক্তের ওপর দিয়ে’ ক্ষমতায় বসা অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত আটজন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে লেনদেন, নিয়োগ–বদলি ও টেন্ডার ক্ষেত্রে বিস্তর দুর্নীতির নথি তার কাছে আছে। তিনি কারও নাম বলেননি, শুধু একটি উদাহরণ টেনে জানান—এক উপদেষ্টার এপিএসের ব্যাংক হিসাবে ২০০ কোটি টাকা পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তার বক্তব্য দ্রুতই কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে ছাপা হলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পটভূমি
দেশে আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর দৃষ্টি রাখছে রাজনৈতিক দলগুলো এবং উন্নয়ন সহযোগীরা। বর্তমান গঠন অনুযায়ী ১০ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদই মন্ত্রিসভার সমান্তরালে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করছে। ২০০৭-৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক আমলের পর এ ধরনের অন্তর্বর্তী ফরম্যাটে এটি দ্বিতীয়বারের মতো প্রশাসন চালাচ্ছে। ফলে উপদেষ্টাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে সামান্য ইঙ্গিতও দ্রুতই খবর হয়ে ওঠে।
প্রতিক্রিয়া
আব্দুস সাত্তারের বক্তব্যের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কে অস্বীকৃতি জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টাসহ সবার উপরই আমাদের আস্থা আছে।’ তিনি দাবি করেন, সাত্তারের মন্তব্য পুরোপুরি তার ‘ব্যক্তিগত’। অন্যদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদের সই করা সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, ‘প্রমাণ ছাড়া ঢালাও অভিযোগ জন আস্থার জন্য ক্ষতিকর।’ সরকার সাত্তারকে যথাযথ তদন্ত সংস্থার কাছে নথি জমা দিতে অনুরোধ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগপন্থি অনেকেই বিএনপির ‘বিভ্রান্তি’ তুলে ধরলেও, কয়েকজন নাগরিক সমাজকর্মী সরকারের দ্রুত তদন্তের আহ্বানকে স্বাগত জানিয়েছেন।
বিশ্লেষণ
পর্যবেক্ষকদের মতে, অভিযোগ-প্রতিবাদ পর্বটি অন্তর্বর্তী সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করবে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতার অপব্যবহারের স্মৃতি এখনো রাজনীতিতে তাজা; ফলে মেরুকৃত পরিবেশে কেউই ‘জন আস্থা’ হারাতে চায় না। দুর্নীতি ইস্যুতে বিএনপি অতীতে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ শানালেও, এবার উপদেষ্টাদের পক্ষে সুর মিলিয়ে দলটি সম্ভবত দুটি লক্ষ্য সামনে রেখেছে: (১) নির্বাচনের তত্ত্বাবধায়ক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ না করা, (২) সামগ্রিক প্রশাসনের সঙ্গে কর্মপরিসর রেখে দেওয়া। অন্যদিকে সরকারও জানে, স্বচ্ছতা নিয়ে সামান্য নেতিবাচক ধারণা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে। তাই দ্রুত ‘প্রমাণ দিন’ কৌশলটি তারা বেছে নিয়েছে।
এরপর কী
সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে নথি জমা দিলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বা সচিবালয়ভিত্তিক তদন্ত কমিটি গঠন হতে পারে—এটাই স্বাভাবিক পথ। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে, এখনো কোনো নির্দেশনা তারা পাননি। বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে স্বচ্ছ এবং সময়সীমাবদ্ধ তদন্তই উত্তেজনা প্রশমিত করতে পারে। অন্যথায় কথার লড়াই আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে।

