বায়তুল মুকাররমে আধুনিক ছোঁয়া: সৌন্দর্যবর্ধনে ১৯০ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প

বায়তুল মুকাররমে আধুনিক ছোঁয়া: সৌন্দর্যবর্ধনে ১৯০ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্প

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের ভেতরের সৌন্দর্য ও সুবিধা বাড়াতে সরকার ১৯০ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে। শনিবার সকালে (৯ আগস্ট) ঢাকার বিএমএ মিলনায়তনে শানে সাহাবা জাতীয় খতিব ফাউন্ডেশনের সম্মেলনে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন এ ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রেখে অভ্যন্তরীণ অংশে আধুনিক আলোকসজ্জা, শীতাতপ, পানি ও অডিও ব্যবস্থার উন্নয়ন হবে। একই সঙ্গে মসজিদ কমিটির ‘একক আধিপত্য’ ঠেকাতে নতুন মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা গেজেট আকারে প্রকাশের প্রস্তুতি চলছে।

পটভূমি

১৯৬৮ সালে ইস্কাটনের স্থপতি আবদুর রশিদের নকশায় নির্মিত বায়তুল মুকাররম দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম সমকালীন মসজিদগুলোর একটি। প্রায় ৩০ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারেন বলে ধারণা করা হয়। ঢাকা শহরের কেন্দ্রভাগে অবস্থিত এই মসজিদ শুধু ইবাদতের স্থানই নয়, ঈদ জামাত, জানাজা, ইসলামি বইমেলা ও নানা ধর্মীয় সভার প্রধান ভেন্যু। এর আগে ২০১১-১৩ ও ২০১৭-১৮ সালে আংশিক সংস্কার হলেও পূর্ণাঙ্গ অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন প্রকল্প এবারই প্রথম হাতে নেওয়া হলো।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• প্রকল্পের মোট বরাদ্দ: ১৯০ কোটি টাকা

• সম্ভাব্য মেয়াদ: ৩০ মাস (প্রাথমিক প্রস্তাব)

• আপগ্রেড হবে ৬ তলা জায়গা, মোট নির্মাণ এলাকা প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বর্গফুট

• নতুন এসি ক্যাপাসিটি: ৩,৫০০ টন, বিদ্যমানের তুলনায় দ্বিগুণ

• স্বয়ংক্রিয় অডিও-ভিজ্যুয়াল ব্যবস্থা বসবে ১৮০+ স্পিকার সহ

• পানির জন্য বসবে ২টি গভীর নলকূপ ও ১ লাখ লিটার ধারণক্ষমতার রিজার্ভয়ার

ড. খালিদ হোসেন জানান, অর্থ বিভাগ থেকে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি টাকা চলতি অর্থবছরেই ছাড় করা হবে।

পরবর্তী পদক্ষেপ

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প পরিচালক দায়িত্ব নিয়ে দ্রুত ডিপিপি (Development Project Proposal) চূড়ান্ত করবেন। এরপর গণপূর্ত অধিদপ্তর আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে ডিজাইনের কাজ দেবে। সব ঠিক থাকলে নভেম্বর থেকে ভেতরের অবকাঠামো সরিয়ে ফেলা ও পাইলিং কাজ শুরু হবে। নীতিমালা অনুযায়ী মসজিদ এলাকায় দিনের বেলা বড় কোনো ভাঙার কাজ হবে না যাতে জামাত ব্যাহত না হয়। শুক্রবার ও তারাবিহর সময় কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।

প্রতিক্রিয়া

ইমাম কাউন্সিলের সভাপতি মাওলানা আবদুল মালেক রুমী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, "মসজিদে প্রবেশ-বাহিরের র‌্যাম্প ও লিফট সুবিধা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিলে বয়স্ক মুসল্লিরা উপকৃত হবেন।" ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজের শিক্ষক ড. মাহবুব হাসান মনে করেন, বাজেট পর্যাপ্ত হলেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক চাপে এ সময়ে এত বড় বরাদ্দ কতটা যৌক্তিক। ধর্ম মন্ত্রণালয় জবাবে বলছে, অর্থের ৭০ শতাংশই যাবে ক্রয়-যোগ্য যন্ত্রপাতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায়, যা দীর্ঘমেয়াদে খরচ বাঁচাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

স্থাপত্য ইতিহাসবিদ সামিয়া ফিরোজ বলেন, "বায়তুল মুকাররমের বিশেষত্ব তার ঘনবসতির ঢাকায় আধুনিক ভাবনার আইকনিক ঘনক আকৃতি। তাই ভেতরে বদল এলেও বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।" ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটের স্থপতি কাজী তানভীরের সুপারিশ, কাঠামোতে অতি-লোড এড়িয়ে ইস্পাতের বদলে হালকা-ওজন প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ভবিষ্যৎ ভূমিকম্প সহনশীলতা বাড়বে।

এর গুরুত্ব কী

বায়তুল মুকাররম শুধু ধর্মীয় নয়, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। প্রতিবছর অন্তত ৫০ লাখ ভক্ত এখানে নামাজ আদায় করেন বলে ইসলামি ফাউন্ডেশনের হিসাব। একে ঘিরে গড়ে উঠেছে কোরান-পাঠাগার, ইসলামি বইয়ের বাজার, পর্যটন-স্মারক দোকান। উন্নয়ন কাজ সফল হলে সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী-বান্ধব প্রবেশপথ, আগুন-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও জেন্ডার-সেনসিটিভ ওজুখানা চালু হবে, যা দেশের অন্যান্য বড় মসজিদ সংস্কারেরও পথ দেখাবে।

More From Author

চাকরিচ্যুতি নিয়ে উত্তেজনা: এস আলম তেল কারখানা ও আল-আরাফাহ ব্যাংকে কর্মীদের বিক্ষোভ

বরগুনায় ছোট ইলিশ কেজি ৫০০ টাকা, বাজারে ক্রেতা-উচ্ছ্বাস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *