ভাইকে এক বছর ঘরবন্দী রাখার অভিযোগ আমির খানের বিরুদ্ধে, ফয়সালের বিস্ফোরক দাবি
বলিউড সুপারস্টার আমির খানের ছোট ভাই ও অভিনেতা ফয়সাল খান এক সাক্ষাৎকারে (পিঙ্কভিলায় প্রকাশিত) জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগে তাঁকে মুম্বাইয়ে আমিরের বাড়িতে টানা এক বছরের বেশি সময় ধরে আটকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরিবার দাবি করেছিল, ফয়সাল সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছেন এবং ‘সমাজের জন্য ক্ষতিকর’। ফোন কেড়ে নেওয়া থেকে শুরু করে বডিগার্ড বসানো ও নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো—সব কিছুই নাকি হয়েছে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে। এ ঘটনার কথা সম্প্রতি প্রকাশ্যে আনায় বলিউডে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। এখনো আমির খান বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো জবাব আসেনি, তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু’ভাইয়ের সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি বলিউডের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আইনগত দায়-দায়িত্ব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে।
পটভূমি
১৯৮৮ সালে ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এ অভিনয়ের মাধ্যমে ফয়সালের বলিউড যাত্রা শুরু হলেও বড়পর্দায় তাঁকে খুব বেশি দেখা যায়নি। ২০০০ সালে ‘মেলা’ ছবিতে দুই ভাই একসঙ্গে কাজ করেন, সেই সময় থেকেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্যে আসে। ২০০৭ সালে পরিবার তাঁর মানসিক স্থিতি নিয়ে আদালতে যায় এবং চিকিৎসার জন্য বাধ্যতামূলক গার্ডিয়ানশিপ চাইলে বিষয়টি আইনি পর্যায়ে গড়ায়। আদালত ফয়সালকে মানসিকভাবে সক্ষম ঘোষণা করলে তিনি স্বাধীনতা ফিরে পান। এবার পিঙ্কভিলায় তিনি বলেন, “ওরা আমাকে পাগল ভেবেছিল, সমাজের জন্য বিপজ্জনক বলেছিল। আমি বুঝতে পারছিলাম না কীভাবে এই ‘চক্রব্যূহ’ থেকে বের হবো।” তাঁর দাবি, ওই সময় বাড়ির বাইরে যেতে পারলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতো, কিন্তু ফোন ও যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
প্রতিক্রিয়া
সংবাদ প্রকাশের পর সরাসরি প্রতিক্রিয়ার জন্য আমির খানের দফতরে যোগাযোগ করলে কেউ মন্তব্য করতে রাজি হননি, জানিয়েছে রয়টার্স। আমিরের ঘনিষ্ঠসূত্রকে উদ্ধৃত করে টাইমস অফ ইন্ডিয়া লিখেছে, ‘পরিবার বিষয়ক ব্যক্তিগত অভিযোগ নিয়ে তাঁরা মিডিয়ায় কথা বলবেন না।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তদের প্রতিক্রিয়া দুই ভাগে বিভক্ত—একদল ফয়সালের কথা বিশ্বাস করে আমিরকে ‘গ্যাসলাইটিং’ ও ‘গার্ডেনড ও‘নিজশিপ’ আইনের অপব্যবহারের’ অভিযোগ তুলছেন; অন্যদল মনে করছেন, অভিনেতার মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস থাকায় পরিবার শুধু সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। বলিউডের সহকর্মীদের কেউই এখনও প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি, তবে মিহির ভাণ্ডারী নামের এক বিনোদন সাংবাদিক টুইটারে লেখেন, “সত্য যা-ই হোক, বলিউড পরিবারগুলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনায় স্বচ্ছ হওয়া দরকার।”
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ভারতের ‘মেন্টাল হেলথকেয়ার অ্যাক্ট ২০১৭’ বলছে, কারও মানসিক অসুস্থতা থাকলেও পরিবার কেবল আদালতের অনুমতি এবং নিবন্ধিত চিকিৎসকের সুপারিশে দীর্ঘমেয়াদি আটক রাখার ব্যবস্থা করতে পারে। দিল্লিভিত্তিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অনন্যা গুপ্ত বাংলাট্রিবিউনকে বলেন, “শুধু সন্দেহের বশে কাউকে গৃহবন্দী করে ওষুধ খাওয়ানো চিকিৎসা নয়, বরং মানবাধিকার লঙ্ঘন।” অপরাধ আইনজীবী রামেশ্বর নায়ার এনডিটিভিকে জানান, “ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওষুধ খাওয়ানো ও অবরুদ্ধ রাখা ‘অপরাধমূলক হেফাজত’-এর মধ্যে পড়তে পারে, যদি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হয়।” তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “সিজোফ্রেনিয়া রোগীর ক্ষেত্রে জটিল সিদ্ধান্ত নিতে হয়; চূড়ান্ত রায়ের আগে দুই পক্ষের মেডিকেল রিপোর্ট জরুরি।” বিশেষজ্ঞরা একসুরে বলছেন, ঘটনা যাই হোক, ভারতীয় বিনোদন জগতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি ও নজরদারি বাড়ানো সময়ের দাবি।
এরপর কী
ফয়সাল খান আপাতত নতুন একটি ছবির স্ক্রিপ্ট পড়ছেন বলে নিজের ইনস্টাগ্রামে জানান, তবে আইনগত পথে হাঁটার ইঙ্গিত দেননি। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নেরও কোনো আভাস মেলেনি। বলিউড পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, আমির খান বিষয়টি ‘পারিবারিক’ বলেই গণমাধ্যমের চাপের মুখেও নীরবতা বজায় রাখতে পারেন। তা সত্ত্বেও ফয়সালের অভিযোগ মানহানিকর মনে হলে আইনি নোটিস পাঠানো হতে পারে। মুম্বাই পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্তে নামার সম্ভাবনা কম, কারণ অভিযোগের সময়সীমা ও স্পষ্ট তথ্য নেই। বর্তমানে আলোচনার কেন্দ্রে আছে দুই বিষয়—(১) পরিবারের ভেতরের দ্বন্দ্ব কীভাবে জনস্বার্থে বিচারযোগ্য হবে, (২) মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বলিউড তারকাদের সচেতনতা কতদূর যাবে? দর্শক ও শিল্পী সমাজের চাপেই হয়তো দুই ভাইকে শিগগিরই প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিক অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে।

