গুলশানে ৩৯০ বোতল বিদেশি মদ জব্দ : ছড়াচ্ছে ঢাকার ‘হাই-এন্ড’ মাদকচক্রের ছায়া
শুক্রবার গভীর রাতে গুলশান-২ এর ১১১ নম্বর সড়কে তল্লাশিচৌকিতে একটি জিপ থামিয়ে ৩৯০ বোতল বিদেশি মদসহ আবদুল কুদ্দুস আলী (২৮) ও জাহিদ বালি ওরফে অপু (৪০)-কে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। অ্যালকোহল বোতলগুলো বিশেষ কায়দায় সিট ও ট্রাঙ্কের নীচে লুকিয়ে রাখা ছিল। একই রাতে শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ২৯৭ বোতল এবং এক দিন আগে কক্সবাজারের পেকুয়ায় অস্ত্রসহ মদ উদ্ধার হয়েছে। ধারাবাহিক অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, ‘হাই-এন্ড’ আবাসিক এলাকা ব্যবহার করে গড়ে ওঠা নতুন মাদক সরবরাহ চক্রের দৌরাত্ম্য আটকাতে তারা রাজধানী ও জেলায় বিশেষ নজরদারি বাড়িয়েছে।
ঘটনাপ্রবাহ
ডিএমপির গুলশান থানার ডিউটি অফিসার জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শুক্রবার (৯ আগস্ট) রাত ৩টা ১০-এ টহল টিম ১০৮ নম্বর সড়কের একটি বাড়ি নজরদারিতে রাখে। বাড়ি থেকে বেরোনো দু’টি গাড়ির একটি পালিয়ে গেলেও জিপটি ১১১ নম্বর সড়কে আটকানো হয়। তল্লাশিতে ৫৮টি কার্টনে রাখা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হুইস্কি, ভদকা ও রাম মোট ৩৯০ বোতল উদ্ধার হয়। মদ বহনে ব্যবহৃত জিপটিও জব্দ করা হয়েছে। কুদ্দুস ও অপু—দু’জনই পেশাদার ‘ডেলিভারি ম্যান’ বলে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে এবং শনিবার আদালতে সোপর্দ করা হবে।
পটভূমি
বাংলাদেশে অনুমোদিত বার ও ডিউটি-ফ্রি শপ ছাড়া বিদেশি মদ বিক্রি ও পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ। তবে কড়া নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ শুল্ক ও ক্রেতাদের ‘ব্র্যান্ডেড’ পণ্যের চাহিদা—এই সুযোগে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় গোপনে মদের ডেলিভারি নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, অনলাইন অর্ডার-কেন্দ্রিক এই বাজারের আকার বছরে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যার বড় অংশই কর আদায়ের বাইরে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• গুলশান অভিযানে উদ্ধার: ৩৯০ বোতল
• একই রাতে নালিতাবাড়ী, শেরপুর: ২৯৭ বোতল (বাজারমূল্য ≈ ১০ লাখ টাকা)
• পেকুয়া, কক্সবাজার (৭ আগস্ট): ২ বোতল মদ ও ১টি দেশীয় এলজি অস্ত্র
• চলতি অর্থবছরে ডিএমপি মাদক শাখার তথ্য: জানুয়ারি-জুলাইয়ে রাজধানীতে বিদেশি মদ উদ্ধার বেড়েছে ২৩ %।
প্রতিক্রিয়া
ডিএমপি মিডিয়া সেলের উপ-কমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, ‘অনেকেই ভাবেন অভিজাত এলাকায় অভিযান কম হয়। আমরা সে ধারণা ভেঙে দিতে চাই।’ গুলশানের স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির নেতা আরিফ কামাল জানান, এলাকায় ভাড়াটে বাড়ি ঘিরে রাতে অচেনা গাড়ি আসা-যাওয়ার ঘটনা সম্প্রতি বেড়েছিল। অপরাধ বিশ্লেষক তানভীর হাসান মনে করেন, পুলিশি তৎপরতা বাড়লেও জোগান বন্ধ না হলে কালোবাজার কমবে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ক্রিমিনোলজি শিক্ষক ড. শিলা রহমান বলেন, ‘কোরিয়ার ডিউটি-ফ্রি লিক্যর থেকে শুরু করে ভারতের সীমান্তপথ—সবখানেই মধ্যস্থতাকারী “কারিয়ার নেটওয়ার্ক” জড়িত। প্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ (ডার্ক সোশ্যাল, ক্রিপ্টো পেমেন্ট) ছাড়া এই বাজার ভাঙা কঠিন।’ এনবিআর সাবেক সদস্য ফারুক আহমেদ মনে করেন, শুল্ক কাঠামোর সরলতা ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে অবৈধ আমদানি নিজে থেকেই কমে যাবে।
এরপর কী
ডিএমপি এবং র্যাব যৌথভাবে ‘অপারেশন ক্লিন ওয়েভ’ নামে একটি বিশেষ অভিযান হাতে নিচ্ছে, যেখানে অননুমোদিত বার, অনলাইন হোম-ডেলিভারি ও বিলাসবহুল গাড়ি টার্গেট করা হবে। গুলশান মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে পলাতক চালকের খোঁজে সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ট্র্যাকিং শুরু করেছেন। পুলিশ সদর দফতর বলছে, গ্রেপ্তার দু’জনকে রিমান্ডে নিয়ে ‘সাপ্লাই চেন’ এবং এর পৃষ্ঠপোষকদের সম্পর্কে তথ্য বের করার পরিকল্পনা রয়েছে।

