আগামী সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: সিইসি নাসির উদ্দিন
রংপুরে নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন শনিবার বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মসৃণ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা ঠিক রাখা হবে ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। তিনি জানান, তফসিল ভোটের অন্তত দুই মাস আগে ঘোষণা করা হবে এবং গতবারের বিতর্কিত প্রিজাইডিং অফিসারদের প্রত্যাহারসহ নতুন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। সামাজিক মাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)–নির্ভর ভুয়া তথ্য ঠেকাতে আলাদা ইউনিট গড়ার কথাও জানিয়েছে কমিশন।
পটভূমি
২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের কম ভোটার উপস্থিতি, সহিংসতা ও ফলাফল নিয়ে বিতর্কের পর থেকেই নির্বাচন কমিশনের ওপর জনগণের আস্থা সংকুচিত হয়েছে। আগামী বছরের শুরুর দিকে হওয়ার কথা ত্রয়োদশ নির্বাচন। এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিজেরা সংগঠিত হচ্ছে রাজনৈতিক দল, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকা অতীতে সহিংসতার হটস্পট হওয়ায় সেখানে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা চলছে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• সম্ভাব্য ভোটকেন্দ্র: প্রায় ৪৩,০০০
• তালিকাভুক্ত ভোটার: ১১ কোটির বেশি
• মাঠ পর্যায়ে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারী: প্রায় ৭ লাখ
• আগামী নভেম্বরে তফসিল ঘোষণার সম্ভাব্য সময়, যদি জানুয়ারিতে ভোট হয়
• সামাজিক মাধ্যম পর্যবেক্ষণে প্রস্তাবিত আলাদা ইউনিট: ১টি, যেখানে ৫০ জন আইটি বিশেষজ্ঞ কাজ করবেন
প্রতিক্রিয়া
সিইসির বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে পুলিশ সদর দফতর। অতিরিক্ত আইজিপি (অপারেশনস) সহিদুল ইসলাম রোববার রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘ভোটের আগে ৬০ দিন ধরে বিশেষ ক্র্যাকডাউন ও এলাকাভিত্তিক গোয়েন্দা নজরদারির রূপরেখা প্রস্তুত।’ তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় প্রথম আলোকে জানান, ‘আস্থা ফেরাতে শুধু ঘোষণা জরুরি নয়, বিরোধী দলের গণসমাবেশে পুলিশের সহিংসতা বন্ধ করাটা প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত।’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করুক—সরকার সে সহযোগিতাই করবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতামত
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. তাসনিম ফিরোজ মনে করেন, “ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সহিংসতা বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ব্যাংক নোটের মতোই ‘ফেক নিউজ’ এখন বড় হুমকি, যেটা সামাল দিতে না পারলে মাঠের সন্ত্রাস দমিয়ে তাও কাজের কাজ হবে না।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক এম এম শাহীন যোগ করেন, “প্রিজাইডিং অফিসার বদল ইতিবাচক, কিন্তু তাদের ওপর স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ কমাতে সেনা ও ম্যাজিস্ট্রেট সমন্বয় জরুরি।”
এরপর কী
• সেপ্টেম্বরের মধ্যেই মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে ইসি।
• অক্টোবর থেকে জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের যৌথ প্রশিক্ষণ।
• ভোটের আগে ৪৮ ঘণ্টা ‘ডিজিটাল নীরবতা’ বিধান এনে ভুয়া খবর ছড়ানো রোধে আইনি খসড়া তৈরি হচ্ছে।
• আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়নে প্রতি পনের দিন অন্তর ইসি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয় সভা হবে।
• আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে সামাজিক মাধ্যমে চিহ্নিত ২০০ ভুয়া খবরের তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন, যাতে ভোটাররা আগে থেকেই সতর্ক হতে পারেন।
শেষ কথা
আইনশৃঙ্খলা, তথ্যদুষণ ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ সামাল দিয়ে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে পারলে ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বড় ধরনের ভোটার উপস্থিতি ফেরাতে পারে বাংলাদেশ। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা যেমনই হোক, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক 信ভঙ্গ এবং সামাজিক মাধ্যমের অবাধ অস্থিরতা সামলাতে না পারলে সিইসির আশাবাদ নিছক বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।

