রাউজানে ১৯ বছর বয়সী মেহেদি হাসানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, চিরকুটে লেখা ‘আমার মরার পিছনে কারও হাত নেই’

রাউজানে ১৯ বছর বয়সী মেহেদি হাসানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, চিরকুটে লেখা ‘আমার মরার পিছনে কারও হাত নেই’

চট্টগ্রামের রাউজান পৌরসভার ঢালারমুখ এলাকায় সোমবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ১৯ বছর বয়সী মেহেদি হাসান হৃদয়ের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বাড়ির কাছ থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে একটি গাছের সঙ্গে দড়িতে ঝুলছিল তাঁর দেহ। বালিশের নিচে পাওয়া গেছে একটি হাতে লেখা চিরকুট, যেখানে হৃদয় উল্লেখ করেছেন, ‘আমার মরার পিছনে কারও হাত নেই, আমি সইচ্ছা ফাঁসি খাইছি, ভালো থেকো আম্মু-আব্বু।’ পুলিশ প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখলেও, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত বক্তব্য দিচ্ছে না। নিহত যুবক রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করতেন এবং সম্প্রতি পড়াশোনা ছেড়ে দেন।

ঘটনাপ্রবাহ

রবিবার গভীর রাতে হৃদয় বাড়ি থেকে বের হন বলে পরিবারের ভাষ্য। পরিবার ভেবেছিল পাশের মহল্লায় একটি বিয়ের দাওয়াতে গেছেন, তাই খোঁজ নেয়নি। সোমবার ভোরে পরিবারের একজন বালিশের নিচে তাঁর মোবাইল ফোন ও চিরকুট খুঁজে পেয়ে দুশ্চিন্তা করেন। পরে বাড়ির লোকজন আশপাশে খোঁজ করতে গিয়ে ঘর থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে একটি কাঁঠাল গাছে তাঁকে ঝুলতে দেখেন। রাউজান থানার ওসি মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ নামিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ঘাড় ভেঙে যাওয়ার আলামত দেখা গেছে, যা উঁচু জায়গা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রেক্ষাপট

হৃদয় রাউজানের রহমত পাড়া সংলগ্ন নঈম সওদাগর বাড়ির আবদুর রহিমের একমাত্র ছেলে। মা-বাবা তাঁকে একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন, তবে পড়াশোনার আগ্রহ কমে গেলে পরিবারের আয়ের জন্য রাজমিস্ত্রির হেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। এলাকার লোকজনের ভাষ্য, হৃদয় শান্ত স্বভাবের ছিলেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর সঙ্গে কারও প্রকাশ্য বিরোধ ছিল না। পরিবার দাবি করেছে, ছেলের গত কিছু দিনের আচরণেও আত্মহননের ইঙ্গিত মেলেনি। ফলে ঘটনার কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• বয়স: ১৯ বছর

• ঘটনাস্থল থেকে লাশের দূরত্ব: বাড়ি থেকে প্রায় ১০০ গজ

• ঘটনাকাল: ১১ আগস্ট সকাল সাড়ে ১১টা (পুলিশ উদ্ধার সময়)

• পরিবারের সদস্য: বাবা-মা সহ ৩ জন

• দেশে ২০২2 সালে পুলিশের রেকর্ডকৃত আত্মহত্যা: প্রায় ১৪ হাজার (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো)

• চট্টগ্রাম জেলায় একই সময়ে আত্মহত্যা: ১,০৫৮ জন

বিশ্লেষণ

জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৫-২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যা মৃত্যুহারের একটি বড় অংশ জুড়ে রেখেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেকারত্ব, শিক্ষাজীবনের চাপ ও সম্পর্কের টানাপোড়েনে এই বয়সে হতাশা বেড়ে যায়। হৃদয়ের ক্ষেত্রে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া ও অস্থায়ী পেশায় যুক্ত হওয়া মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে—যা পুলিশ এখনই উড়িয়ে দিচ্ছে না। তবে আত্মহত্যার অভিযোগ নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও অনুসন্ধান করতে হবে, কারণ মাঠপর্যায়ে জোরপূর্বক চিরকুট লিখিয়ে বা হত্যা করে ‘আত্মহত্যা’ সাজানোর অভিযোগ আগেও উঠেছে।

পরবর্তী পদক্ষেপ

পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর ধরন, সময় ও সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক মতামত দেবে। একই সঙ্গে হৃদয়ের মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে, যাতে শেষ কল লিস্ট, মেসেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করা যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়নি, তবে তারা ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ তদন্ত চান। স্থানীয় কাউন্সিলর ও শিক্ষকরা বলেন, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার প্রয়োজনীয়তা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

শেষ কথা

হৃদয়ের মৃত্যু শুধুই একটি পারিবারিক ট্রাজেডি নয়, এটি তরুণদের মানসিক অস্থিরতা ও প্রান্তিক মানুষের সহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল। তদন্তে যদি সত্যিই এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়, তাহলে সামাজিক-প্রশাসনিক উভয় পর্যায়েই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হবে। আর যদি অন্য কোনো অপরাধের সূত্র মেলে, তবে আইনি বিচারের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠবে কেন প্রথমদিকেই ‘আত্মহত্যা’ ধরনা এগিয়ে এল। উভয় ক্ষেত্রেই ঘটনাটি আমাদের সতর্ক করে দিয়ে গেল, যেন হতাশাগ্রস্তদের পাশে প্রয়োজনীয় সময়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা থাকে।

More From Author

রাঙ্গুনিয়ায় ইয়াবাসহ গ্রেফতার ‘মাদক সম্রাট’ মাসুক; এলাকায় স্বস্তি ও প্রশ্ন

জাপানের কুমামোতোতে রেকর্ড বৃষ্টিতে বন্যা, ৩০ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে যেতে নির্দেশ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *