যুক্তরাজ্যে প্রাক্তন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামানের তিন হাউজিং কোম্পানি প্রশাসনের হাতে
যুক্তরাজ্যের আদালতের অনুমতিতে গ্র্যান্ট থরন্টন যুক্ত প্রশাসক ২৯ জুলাই সাবেক বাংলাদেশি ভূমিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি সাইফুজ্জামান চৌধুরীর মালিকানাধীন তিনটি আবাসন কোম্পানি– জেটিএস প্রপার্টিজ, রুখমিলা প্রপার্টিজ ও নিউ ভেঞ্চার্স (লন্ডন)–এর দায়িত্ব নেয়। লন্ডনভিত্তিক ব্যবসা সংবাদপত্র ‘Bisnow’ ও ঢাকার ‘অর্থসূচক’ জানায়, তিন কোম্পানির ঘোষিত সম্পদ প্রায় ১৪২ মিলিয়ন পাউন্ড হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর ব্যাংক–ঋণের বোঝা ৭৮ মিলিয়ন পাউন্ড। ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা চালু রাখতে ব্যর্থ হওয়ায় কোম্পানিগুলোকে দেউলিয়ার প্রক্রিয়ায় ‘অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি বাংলাদেশি রাজনীতিবিদের বিদেশে গড়া সন্দেহজনক সম্পদের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের চলমান আর্থিক নজরদারি জোরদারেরই অংশ।
মূল তথ্য
জেটিএস প্রপার্টিজের সম্পদ সবচেয়ে বেশি—৭৭ মিলিয়ন পাউন্ড। বাকি দুই প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সম্পদ ৬৫ মিলিয়ন পাউন্ড। তিন প্রতিষ্ঠানের মূল ধারদেনা ৭৮ মিলিয়ন পাউন্ড, যার বড় অংশ দিয়েছে সিঙ্গাপুরের ডিবিএস ব্যাংক ও ব্রিটিশ ঋণদাতা কয়েকটি হাউজিং ফান্ড। প্রশাসক নিয়োগের পর থেকেই সম্পদ বিক্রির পরিকল্পনা করছে গ্র্যান্ট থরন্টন, যাতে পাওনাদারদের অন্তত কিছু অংশ ফেরত দেওয়া যায়।
পটভূমি
সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৪–১৮ মেয়াদে বাংলাদেশের ভূমিমন্ত্রী ছিলেন। ওই সময় ও পরে লন্ডনের আবাসন খাতে তাঁর ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি বিনিয়োগ ধরা পড়ে। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে মানি–লন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা করেছে। আর যুক্তরাজ্যের জাতীয় অপরাধ সংস্থা (NCA) ইতোমধ্যে ১৭০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ ‘আনএক্সপ্লেইন্ড ওয়েলথ অর্ডার’-এর আওতায় জব্দ করেছে। এ বছর শুরুর দিকেও তাঁর আরও তিনটি কোম্পানি, মোট সম্পদ ২৯ মিলিয়ন পাউন্ড, প্রশাসনে গিয়েছিল।
প্রতিক্রিয়া
দুদকের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থসূচককে বলেন, "বৈদেশিক তদন্তে অগ্রগতি আমাদের মামলাকে শক্তিশালী করবে।" আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা সংস্থার (টিআই) বাংলাদেশ অফিস জানিয়েছে, বিদেশে গোপনে গড়া সম্পদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ বিশ্বের অন্যান্য গন্তব্যেও চাপ সৃষ্টি করবে। সাইফুজ্জামান বা তাঁর পরিবারের কেউ এখনো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক আবুল বারকাত মনে করেন, "রাজনীতিবিদদের অফশোর সম্পদের বিষয়ে বিদেশি বিচারব্যবস্থার কঠোরতা দক্ষিণ এশিয়ার স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়তা করবে।" লন্ডনের আইনজীবী ফারাহ খান জানান, ব্রিটেনে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সাধারণত কর্পোরেট দেউলিয়া প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ, যেখানে আদালত প্রয়োজনে পরিচালকদের ব্যক্তিগত দায়ও নির্ধারণ করতে পারে।
এরপর কী
প্রশাসকদের প্রথম কাজ হবে সম্পদের স্বাধীন মূল্যায়ন ও পাওনাদারদের তালিকা চূড়ান্ত করা। তহবিল সংকুলান করতে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ বিক্রি শুরু হতে পারে ইতিমধ্যে অধিগৃহীত অন্য তিন প্রতিষ্ঠানের মতোই। বাংলাদেশ সরকার ও দুদক ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিসট্যান্স চুক্তির আওতায় তথ্য বিনিময় বাড়ানোর কথা ভাবছে, যাতে লন্ডনে বিক্রি হওয়া সম্পদের অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা যায়।

