মোদি-পুতিন ফোনালাপের পর নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ, ট্রাম্পের শুল্ক ও আলাস্কা বৈঠক বাড়াচ্ছে চাপ
শুক্রবার, ৮ আগস্ট রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন টেলিফোনে প্রায় আধা ঘণ্টা কথা বলেন। নয়াদিল্লি ও মস্কোর সরকারি সূত্র জানায়, আলোচনায় ইউক্রেন যুদ্ধের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং আগামী ভারত–রাশিয়া শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি উঠে আসে। মোদি শান্তিপূর্ণ মীমাংসার পক্ষে ভারতের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন এবং বছরের শেষ দিকে পুতিনকে নয়াদিল্লিতে স্বাগত জানানোর আগ্রহ জানান। ফোনালাপটি হয় এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ও এবার রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ তেল আমদানিতে ৫০% শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়ে ভারতের জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছেন এবং আগামী ১৫ আগস্ট আলাস্কায় পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের রূপরেখা প্রকাশ করেছেন। ঘটনাগুলো একসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়া থেকে ওয়াশিংটন পর্যন্ত কূটনৈতিক টানাপড়েনকে তীব্র করেছে।
প্রেক্ষাপট
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে ভারত ‘কৌশলগত নিরপেক্ষতা’ বজায় রেখে মস্কোর সঙ্গে শক্ত জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া এখন ভারতের তেলের দ্বিতীয় বৃহৎ উৎস। তবে ট্রাম্প ৫০% আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়ে সেই সম্পর্ককে তীব্র চাপের মুখে ফেলেছেন। এর মাঝেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন, যেটি বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকের পূর্বসূচনা বলে মনে করা হচ্ছে। ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর মোদি–পুতিন ফোনালাপ, যা নয়াদিল্লির জন্য সমন্বিত ‘ড্যামেজ কন্ট্রোল’ ও ‘সিগন্যালিং’ উভয়ই।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• ৫০% – রুশ তেল আমদানিতে ট্রাম্প ঘোষিত সম্ভাব্য শুল্ক।
• ১.৪ বিলিয়ন – ভারতের জনসংখ্যা, জ্বালানি নিরাপত্তার মূল স্বার্থ।
• ১ বছর – করোনা-বিরতির পর পুনরায় মোদি–পুতিন সরাসরি শীর্ষ সম্মেলন হতে যাচ্ছে ২০২৪-এর শেষ ত্রৈমাসিকে।
• ১৫ আগস্ট – আলাস্কায় নির্ধারিত ট্রাম্প–পুতিন বৈঠকের দিন, যেখানে ‘অঞ্চল বিনিময়’ প্রস্তাব আলোচনায় আসতে পারে।
প্রতিক্রিয়া
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিকে ‘অন্যায় ও অযৌক্তিক’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এনডিটিভিকে এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের তেল ক্রয়ের মূল ভিত্তি বাজারমূল্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা।’ মস্কো থেকে ক্রেমলিন জানিয়েছে, ‘দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও গভীর করতে উভয় নেতা সম্মত হয়েছেন।’ ওয়াশিংটনে রিপাবলিকান শিবির ট্রাম্পের অঞ্চল-বিনিময় ইঙ্গিতকে ‘বিকল্প কূটনীতি’ হিসেবে প্রশংসা করলেও ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নেতারা তীব্র বিরোধিতা করেছেন। আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা সত্ত্বেও পুতিনের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র–যাত্রা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি–পুতিন আলাপ মূলত দুটি বার্তা দেয়: প্রথমত, নয়াদিল্লি ও মস্কো জোট অটুট; দ্বিতীয়ত, ভারত যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়া কারও সাথেই সম্পর্ক ছিন্ন করবে না। ট্রাম্প নির্বাচিত হলে উচ্চ শুল্ক বাস্তবায়ন করলে ভারতের রিফাইনারি খরচ বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত ক্রুড আমদানি কমিয়ে দেবে এবং বিশ্ববাজারে নতুন চাহিদা–সরবরাহ সমীকরণ তৈরি করবে। একই সময়ে পুতিন–ট্রাম্প আলাস্কা বৈঠক যদি আসলেই হয়, তা ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনী প্রচারেও বড় প্রভাব ফেলবে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে, শান্তিচুক্তিতে ‘অঞ্চল বিনিময়’ ধারণা গৃহীত হলে তাদের বহুমুখী কূটনীতি সচল রাখতে সহজ হবে; আর প্রত্যাখ্যাত হলে ‘নিউ কোল্ড ওয়ার’ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি থাকছে।
এরপর কী
আগামী কয়েক সপ্তাহে নয়াদিল্লি রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্তরে তিনটি দৌড়ঝাঁপ চালাবে: ১) জি-২০ সভাপতির দায়িত্বে শীর্ষ সম্মেলন, যেখানে রাশিয়া–ইউক্রেন ইস্যুতে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে; ২) পুতিনের সম্ভাব্য ভারত সফরের প্রস্তুতি, যেখানে প্রতিরক্ষা, পারমাণবিক শক্তি ও পেমেন্ট সিস্টেম নিয়ে চুক্তি হতে পারে; ৩) ট্রাম্পের শুল্ক পরিকল্পনা থামাতে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে লবিং। আলাস্কায় ট্রাম্প–পুতিন কথিত বৈঠক সফল হলে দিল্লি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে; ব্যর্থ হলে, ভারতের সামনে রুশ তেল ছাড়া বিকল্প রুটম্যাপ বের করার চাপ বাড়বে।

