ভাসানী প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ দাবিতে শিক্ষার্থীর আমরণ অনশন, জাগছে ক্যাম্পাস রাজনীতি
টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (মাভাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (এমবিএসটিইউসিএসইউ) গঠনের দাবিতে ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. আক্তারুজ্জামান সাজু সোমবার সকাল ১১টা থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে আমরণ অনশনে বসেছেন। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ ৯ দফা দাবির অন্যতম এই দাবি আদায়ে শতাধিক সহপাঠী প্রতীকী অনশনে যোগ দিয়ে সংহতি প্রকাশ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো লিখিত প্রতিশ্রুতি না দিলে তিনি পানি ছাড়া অনশন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বলে রাইজিংবিডি জানিয়েছে।
বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় ক্যাম্পাসে প্রতিনিধিত্বশূন্যতার অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার—চট্টগ্রাম বন্দরের আন্দোলন দমাতে ঘুষ দাবি (ঢাকাটাইমস) কিংবা কুষ্টিয়ায় সিসিটিভি অচল হয়ে অপরাধ বাড়া (রাইজিংবিডি)—প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে সামনে এনে আবার সংগঠিত হচ্ছেন।
পটভূমি
মাভাবিপ্রবি ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করলেও এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচিত কোনো ছাত্র সংসদ নেই। ২০১৯ সালে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ দফা দাবি তুলে ধরে, যার মধ্যে প্রথম সারিতেই ছিল গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ চালু করা। একই দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়েও কর্মসূচি হয়েছে। সোমবারের অনশন সে ধারাবাহিকতা নতুন করে উস্কে দিল। সাজু জানান, "ছাত্র সংসদ হলে প্রশাসনের জবাবদিহিতা তৈরি হবে, ন্যায্য দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে এবং নেতৃত্ব গড়ে উঠবে।" তিনি রিজেন্ট বোর্ডের পরবর্তী বৈঠকে ছাত্র সংসদ অনুমোদন ও গঠনতন্ত্র খসড়া কমিটি গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চান।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
১ – আমরণ অনশনে রয়েছেন আক্তারুজ্জামান সাজু
৯ – বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মোট দাবি
৬৮০০+ – মাভাবিপ্রবির মোট শিক্ষার্থী (শিক্ষাবর্ষ ২০২৪-২৫)
০ – প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন
১৫ – বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বছর পার হলেও এখনও স্বতন্ত্র ছাত্রভোট হয়নি
প্রতিক্রিয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর আনুষ্ঠানিক মন্তব্য না করলেও একটি উচ্চপদস্থ সূত্র বলে, "ছাত্রদের দাবি রিজেন্ট বোর্ডে তোলা হবে; তবে অনশন ভাঙতে আমরা অনুরোধ জানাচ্ছি।" শিক্ষার্থীরা বলছেন, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, লিখিত সিদ্ধান্ত পেলেই অনশন ভাঙা হবে। ঢাকাটাইমস প্রকাশিত পৃথক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্দোলন দমাতে ঘুষ নেয়ার অভিযোগে চট্টগ্রামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) এক নেতার অডিও ফাঁস হয়েছে—যা ক্যাম্পাসের দাবিকে "দুর্নীতি বিরোধী বৃহত্তর লড়াইয়ের" অংশ বলেই তুলে ধরছে ছাত্ররা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদেরโพস্টে ‘#BringBackStudentUnion’ হ্যাশট্যাগে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি বিনিময় দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রবিউল ইসলাম মনে করেন, "নির্বাচিত ছাত্র সংসদ থাকলে ছোটখাটো অসন্তোষ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সমাধান হয়, প্রশাসনিক বোঝাপড়া বাড়ে। অনশন বা সহিংসতার ঝুঁকিও কমে।" মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক নূরুন্নাহার দাবি করেন, সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ সমাবেশ অধিকার হলেও তা নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জরুরি।
এরপর কী
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার বিকেলে জরুরি শিক্ষক–শিক্ষার্থী সমন্বয় বৈঠক ডেকেছে। সেখানে অনশনের দাবি ও শিক্ষার্থীর শারীরিক অবস্থা—দু’টিরই পর্যালোচনা হবে। মেডিকেল সেন্টার সূত্র বলছে, পানিশূন্যতায় সাজুর কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে; ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে স্যালাইন না পেলে হাসপাতাল নেয়ার পরামর্শ দিয়েছে তারা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দিয়েছে, লিখিত সিদ্ধান্ত না এলে বুধবার থেকে ধারাবাহিক কর্মসূচি—ক্লাস বর্জন, ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল ও টাঙ্গাইল-ঢাকা মহাসড়কে প্রতীকী মানববন্ধন—চালাবে। ফলে নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রিজেন্ট বোর্ডের পরবর্তী সভা আগামী ২২ আগস্ট; ততদিনে সুরাহা না হলে ছাত্রদের প্রতিবাদ নজিরবিহীন মাত্রায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা শিক্ষাবিদদের।

