‘পক্ষে-বিপক্ষ’ তর্ক নয়, জাতীয় ঐক্য চাই: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ৫৪ বছর পর সালাহউদ্দিন আহমদের হুঁশিয়ারি

‘পক্ষে-বিপক্ষ’ তর্ক নয়, জাতীয় ঐক্য চাই: মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ৫৪ বছর পর সালাহউদ্দিন আহমদের হুঁশিয়ারি

শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর ‘স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে’ বলে জনগণকে ভাগ করা চলতে পারে না। তিনি দাবি করেন, ১৯৭১-এ অস্ত্র হাতে না থাকলেও মানসিকভাবে দেশের সব মানুষই স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক গবেষণা সংস্থা সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি পাহাড়ের সাম্প্রতিক কুকি-চিন সঙ্কটকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে উল্লেখ করে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। সালাহউদ্দিন বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ দেশের সব নাগরিককে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নইলে জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। বৈঠকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী ও গবেষক-শিক্ষাবিদেরা মিলিয়ে নানা দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।

পটভূমি

স্বাধীনতার আদর্শ নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন বাংলাদেশে নতুন নয়। ১৯৭৫-এর পর সামরিক শাসন, ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ২০০৮-এর পরের দুই বড় রাজনৈতিক দলে বিভক্ত রাজনীতির মাঝেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ বড় বিতর্কিত টার্ম হয়ে ওঠে। সরকারি দল প্রায়ই বিএনপি-জামায়াতকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি’ আখ্যা দেয়, আর বিরোধী দলগুলোর দাবি—এটি ভোট রাজনীতির হাতিয়ার। সালাহউদ্দিন আহমদ সেই বিতর্ককে ‘চেতনা ব্যবসা’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এতে গণতন্ত্রের পথ সংকুচিত হয়।

এর গুরুত্ব কী

২০২৪-এর নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক মেরুকরণ যখন তুঙ্গে, তখন জাতীয় ঐক্যের বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কুকি-চিন বিদ্রোহ, রোহিঙ্গা সঙ্কট এবং ভূরাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ঘিরে উদ্বেগ বেড়েছে। বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিনের মন্তব্য তাই শুধু দলীয় বক্তব্য নয়, নিরাপত্তা নীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বৈঠকে মূল প্রবন্ধকারী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ, ‘চীনের কুনমিং থেকে মৈত্রী করিডর পর্যন্ত ভারতের নীতি, আবার রোহিঙ্গা–মিয়ানমার ইস্যু—সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে পাহাড়কে অস্থিতিশীল রাখতে একটি বহুমাত্রিক খেলা চলছে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুকোমল বড়ুয়া মনে করেন, ‘আদিবাসী’ শব্দ নিয়ে বিতর্ক না বাড়িয়ে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সমঅধিকার নিশ্চিত করলেই সংকট কমবে। আর গবেষক মেহেদী হাসান বলেন, ‘চেতনা নিয়ে বাণিজ্য বন্ধ করে পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কর্মসূচি দরকার।’

প্রতিক্রিয়া

সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিএনপি নিজেরাই ২০০১-০৬ এ ক্ষমতায় থেকে রাজাকার পুনর্বাসন করেছে; এখন ঐক্যের কথা বলা রাজনৈতিক ভণ্ডামি।’ অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নায়েবে আমির শাহজাহান চৌধুরী বৈঠকে অংশ নিয়ে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষে জুজু দেখিয়ে ভোটের আগেই বিরোধী মত দমন করা হচ্ছে।’ সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই সালাহউদ্দিনের বক্তব্যকে ‘প্রয়োজনীয় আত্মসমালোচনা’ হিসেবে স্বাগত জানালেও আওয়ামীপন্থী ট্রলগুলো তাঁকে ‘ভাইরাস ক্লিনিকের নতুন কৌশল’ বলে কটাক্ষ করেছে।

এরপর কী

সালাহউদ্দিন আহমদ ‘সব সত্তাকে বাংলাদেশি’ করার কথা বললেও আদিবাসী সংগঠনগুলো সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে আগামী সেপ্টেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশ ডাকছে। সরকার পাহাড়ে নিরাপত্তা বাড়াতে বিশেষ ‘ইন্টিগ্রেটেড টাস্ক ফোর্স’ গঠনের ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি দ্রুত একটি ‘জাতীয় সংলাপ’ আয়োজনের মাধ্যমে বিভাজন নিরসনে সিভিল সোসাইটির সহযোগিতা চায়। খসড়া প্রস্তাব আগামী সপ্তাহে দলের স্থায়ী কমিটিতে উঠবে বলে জানা গেছে।

More From Author

আগামী সংসদ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষণই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: সিইসি নাসির উদ্দিন

গুলশানে ৩৯০ বোতল বিদেশি মদ জব্দ : ছড়াচ্ছে ঢাকার ‘হাই-এন্ড’ মাদকচক্রের ছায়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *