নির্বাচনে ৮০ হাজারের বেশি সেনা মোতায়েন, পুলিশের বডি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক হবে
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (সম্ভাব্য ডিসেম্বর ২০২৫) সুষ্ঠু ও নিরাপদ ভোট নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর ৮০ হাজারেরও বেশি সদস্য মাঠে থাকবেন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সোমবার (১১ আগস্ট) কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের পর তিনি বলেন, পুলিশের পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিজিবি ও র্যাবও মোতায়েন করা হবে। এছাড়া ভোটকালে পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা থাকবে, যাতে প্রতিটি অভিযান ও তল্লাশির ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষিত হয়।
উপদেষ্টা দাবি করেন, জুলাই মাসের তুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো হয়েছে এবং বিদ্যমান পরিস্থিতিতে “নির্বাচন করতে কোনো সমস্যা নেই”। তিনি রাজনৈতিক দল, ভোটার ও সাধারণ নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সহযোগিতা চেয়েছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন যে “নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয়”—এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া নজরদারি চালাবে।
গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
• সেনাবাহিনী: ৮০,০০০+ সদস্য
• অন্যান্য বাহিনী: নৌবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, আনসার
• বডি ক্যামেরা: সব অন ডিউটি পুলিশ সদস্যের জন্য বাধ্যতামূলক
• প্রতিবেদন প্রকাশের তারিখ: ১১ আগস্ট ২০২৫
• সম্ভাব্য নির্বাচন: ডিসেম্বর ২০২৫ (সরকারি সূচি এখনও ঘোষণা হয়নি)
প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে ভোটের সময় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন নতুন নয়, তবে এত বড় পরিসরে সেনা নামানোর ঘোষণা এবারই প্রথম। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৫০ হাজার সেনা ছিল; ২০১৪ সালে সংখ্যাটি ছিল তারও কম। নির্বাচনকালীন সহিংসতা, ব্যালট কেন্দ্র দখল ও ভোটার ভীতি দূর করতে অতিরিক্ত বাহিনী মাঠে রাখার দাবি অনেকদিনের। শাসক দল আওয়ামী লীগ বলছে, বড় প্রস্তুতি ‘অভূতপূর্ব সুরক্ষা’ নিশ্চিত করবে। বিএনপিসহ বিরোধীরা বরাবরের মতো সেনা মোতায়েনকে স্বাগত জানালেও বাছাই করা মামলার আশঙ্কা তুলেছে।
প্রতিক্রিয়া
• বিএনপি মুখপাত্র সৈয়দ জাহিদুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, “সেনা মোতায়েন ইতিবাচক, তবে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা না থাকলে লাভ হবে না।”
• আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল আহসান প্রগতি সাংবাদকে বলেন, “বডি ক্যামেরা ব্যবস্থা অনিয়মের অভিযোগ কমাবে, বিরোধীদের সন্দেহও দূর হবে।”
• ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বার্তা সংস্থাকে জানান, “ভিডিও প্রমাণ সংরক্ষণ ভালো উদ্যোগ হলেও ফুটেজ যেন গোপন না থাকে, সেজন্য একটি স্বতন্ত্র তদারকি কমিটি দরকার।”
বিশ্লেষণ
সেনা মোতায়েন বাড়ানো এবং বডি ক্যামেরা চালু—দুটি সিদ্ধান্তই আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের আস্থায় আনতে লক্ষ্য স্থির করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। ২০২২ ও ২০২৩ সালে একাধিক পৌর ও উপনির্বাচনে সহিংসতার অভিযোগ এসেছে; যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরবর্তী জাতীয় ভোট ‘অংশগ্রহণমূলক ও স্বাধীন’ না হলে ভিসা রestriction-এর হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সরকার তাই দৃশ্যমান নিরাপত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে এক দিকে ভোটার ভয় কাটাতে, অন্য দিকে বিদেশি চাপ কমাতে চায়।
তবে শুধু শক্তিবাহিনী বাড়ালেই স্বচ্ছতা আসে না। ২০১৮ সালের নির্বাচনে মোতায়েনকৃত বাহিনী অনেক ক্ষেত্রেই বিচ্ছিন্ন থেকে গেছে; কেন্দ্রীয় কমান্ড ও ইলেকশন কমিশনের সমন্বয় ঘাটতি ছিল—যা এবারও চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ভিডিও ক্যামেরা সবক্ষেত্রে চালু থাকবে কীভাবে, সেই প্রযুক্তিগত ও ডেটা-সংরক্ষণ বিধিমালাও এখনও প্রকাশ পায়নি।
এরপর কী
• নির্বাচন কমিশন আগামী মাসে আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণার পর বাহিনীগুলোর মোতায়েন ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত করবে।
• স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের ক্যামেরা ব্যবহারবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ করবে বলে জানা গেছে।
• সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করে ‘আচারসংহিতা’ মানতে লিখিত অঙ্গীকার নেওয়ার উদ্যোগ চলবে।
• আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল এবং গণমাধ্যমের জন্য অনলাইন ‘ফুটেজ রিকোয়েস্ট পোর্টাল’ চালুর সুপারিশ করেছে টিআইবি ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।
শেষ কথা
বাংলাদেশের ভোট-রাজনীতিতে নিরাপত্তা ইস্যুটি যতটা বাস্তব, ততটাই রাজনৈতিক প্রতীকী। সেনা সংখ্যা ও ডিভাইস যোগ করলে দৃশ্যে বদল আসতে পারে, কিন্তু প্রকৃত স্বচ্ছতা বদ্ধমূল হবে কেবল তখনই, যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলনিরপেক্ষ থাকবে এবং নির্বাচন কমিশন তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। তাই ৮০ হাজার সেনা ও হাজারো ক্যামেরা শেষ পর্যন্ত ভোটারের আস্থা বাড়াতে পারে কি না, সেটা নির্ভর করবে বাস্তব প্রয়োগ এবং ফুটেজের স্বচ্ছতা পর্যবেক্ষণের উপর।

