নিউ মার্কেটে সেনা অভিযানে ১,১০০ ধারালো অস্ত্র জব্দ, কিশোর গ্যাং নেটওয়ার্কে আঘাত

নিউ মার্কেটে সেনা অভিযানে ১,১০০ ধারালো অস্ত্র জব্দ, কিশোর গ্যাং নেটওয়ার্কে আঘাত

শনিবার রাতে রাজধানীর নিউ মার্কেট এলাকায় ৪৬ স্বতন্ত্র ব্রিগেডের ‘ডেয়ারিং টাইগার্স’ দল হঠাৎ অভিযান চালিয়ে তিনটি ক্রোকারিজ দোকানের গোপন ঘর থেকে সামুরাই, চাপাতি, কুড়াল ও ছুরি মিলিয়ে ১,১০০-রও বেশি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করে। ঘটনাস্থল থেকেই নয়জন দোকান মালিক ও কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিম উদ্দিন জানান, এসব অস্ত্র কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের কাছে সরবরাহ করা হচ্ছিল। একই রাতে গাজীপুরে বাসের হেলপারের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের পর প্রধান আসামি চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার এবং নাটোরের লালপুরে অবৈধ অস্ত্র নিয়ে বারবার গুলিবর্ষণের ঘটনা—সব মিলিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বেআইনি অস্ত্রের প্রবাহ ও সহিংসতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

প্রেক্ষাপট

সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, নিউ মার্কেটের ‘মমতাজ ট্রেডার্স’, ‘শাকিল ক্রোকারিজ’ ও ‘থ্রি ডট ক্রোকারিজ’ নামের দোকানগুলোয় বহুদিন ধরে সামগ্রী রাখার আলমারি ও তোষকের নিচে অস্ত্র মজুত করা হচ্ছিল। ভোররাত পর্যন্ত চলা অভিযানে সামুরাই তলোয়ার, চাপাতি, চাইনিজ কুড়াল, মিট হ্যামার ও চাকু–সব মিলিয়ে ১,১০২টি ধারালো অস্ত্র উদ্ধার হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন রুকনুজ্জামান, রাব্বি, রোমান, আলী আকবর, সাজিদ হাসান, আলী, হৃদয় মিয়া, নুর হোসেন ও স্বপন। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নিউ মার্কেট থানা।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• উদ্ধারকৃত ধারালো অস্ত্র: ১,১০২টি

• গ্রেপ্তার: ৯ জন

• সেনাবাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে মোট উদ্ধার (গত এক বছর): ৬,০০০-এর বেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় ২ লাখ রাউন্ড গুলি (সেনা সদর দপ্তর)

• লালপুর উপজেলায় গত পাঁচ মাসে গুলির ঘটনা: ৬টি (পুলিশ)

• গাজীপুর হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার: ২ জন, উদ্ধারকৃত মরদেহের খণ্ড: ১ (মাথাসহ)

পটভূমি

রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের সহিংস শোডাউন দিন দিন বাড়ছে। ডেপুটি পুলিশ কমিশনারদের ভাষ্য, ফেসবুক লাইভে ‘শক্তি প্রদর্শন’ করতে এ ধরনের অস্ত্রই বেশি ব্যবহার করে কিশোররা, কারণ এগুলি সহজে বহনযোগ্য ও লাইসেন্সের প্রয়োজন নেই। রাজধানীর বাইরে চিত্র আরও বিষম। নাটোরের লালপুরে বালুমহাল দখলকে কেন্দ্র করে স্পিডবোটে এসে প্রকাশ্যে গুলি করার ঘটনা পাঁচ মাসে ছয়বার ঘটেছে, অথচ একটি অস্ত্রও উদ্ধার হয়নি। গাজীপুরে খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের মামলায়ও পুলিশ ধারণা করছে ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এসব ঘটনার সূত্র ইঙ্গিত করে যে সস্তা ধারালো অস্ত্র শহর থেকেই জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে যাচ্ছে।

প্রতিক্রিয়া

প্রেস ব্রিফিংয়ে লেফটেন্যান্ট কর্নেল নাজিম উদ্দিন বলেন, "শখের নামে কেউ চাপাতি কিনলেও তা শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের হাতে গিয়ে সাধারণ মানুষ আক্রান্ত করছে।" ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তাঁর সরাসরি অনুরোধ, "আইন মেনে বিক্রির রসিদ রাখুন, সন্দেহজনক ক্রেতাকে ফেরান।" ঢাকা কলেজের সমাজবিজ্ঞানী ড. আমিনুল হক ডেইলি আমাদের সময়কে জানান, কিশোর গ্যাং দমনে স্কুল-কলেজ ও পরিবারকে একইসঙ্গে সচেতন হতে হবে; কেবল ধরপাকড়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়। লালপুরের সুশীল সমাজ সেনা অভিযানের প্রশংসা করলেও প্রশ্ন তুলেছে, রাজধানীর মতো মাঠপর্যায়ে কখন অভিযান নামবে পুলিশ–সেনা।

এরপর কী

গ্রেপ্তারদের জিজ্ঞাসাবাদ করে অস্ত্র সরবরাহের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করতে চান তদন্তকারীরা। সেনাবাহিনী সূত্র বলছে, ঢাকায় যে গুদামগুলোকে ‘সোর্স পয়েন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেগুলিতে ধারাবাহিক অভিযান চলবে। পুলিশ সদর দপ্তর একইসঙ্গে অনলাইনে ধারালো অস্ত্র বিক্রির বিজ্ঞাপন পর্যবেক্ষণ ও কিশোরদের গ্রুপচ্যাট মনিটরিং বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আইনজীবীদের ধারণা, অস্ত্র আইনে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও দ্রুত বিচার না হলে প্রতিরোধ কার্যকর হবে না। ফলে এখন নজর নতুন অস্ত্র আইনের খসড়া ও দ্রুত ট্রায়াল ট্রাইব্যুনালের দিকে।

More From Author

ঢাকার নিউমার্কেটের তিন দোকানে সেনা অভিযানে ১,১০০ ধারালো অস্ত্র, গ্রেপ্তার ৯

উপদেষ্টা সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’: মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কঠোর বার্তা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *