নারী আসন বিতর্কে চাপ বাড়াচ্ছে নাগরিক সমাজ

নারী আসন বিতর্কে চাপ বাড়াচ্ছে নাগরিক সমাজ

শনিবার (৯ আগস্ট) ঢাকার কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে নাগরিক সমাজ, অধিকারকর্মী ও একাধিক কমিশনের সদস্যরা আগামী জাতীয় নির্বাচনে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন প্রসঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের খসড়া সুপারিশ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সাধারণ আসনে মাত্র ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন ও আগের পদ্ধতিতে পরোক্ষভাবে ৫০টি সংরক্ষিত আসন রাখায় বক্তারা এটিকে "পুরুষতান্ত্রিক পশ্চাৎগতি" বলে আখ্যা দেন। তারা সরাসরি ভোটে কমপক্ষে ১০০টি সংরক্ষিত আসন এবং সাধারণ আসনে ৩৩–৫০ শতাংশ পর্যন্ত নারী প্রার্থী নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার সভায় স্বীকার করেন যে "পুরুষতন্ত্র জয়ী হয়েছে" এবং বিষয়টি নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন আছে। অংশগ্রহণকারীরা গণস্বাক্ষর অভিযান, কমিশন ঘেরাও কিংবা প্রয়োজনে ভোট বর্জনের হুমকি দিয়ে বলেন, নারীর উপস্থিতি ছাড়া বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাবে।

প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের সংসদে বর্তমানে ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় কোটা অনুযায়ী মনোনীত সদস্যরা পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশন চলমান নির্বাচনব্যবস্থায় বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব করছে, যার মধ্যে ছিল সাধারণ আসনে ৫ শতাংশ নারী মনোনয়ন ও সংরক্ষিত আসন পদ্ধতি অপরিবর্তিত রাখা। জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনায় এ ব্যবস্থাকে সংকীর্ণ মনে করছেন নারী অধিকারকর্মীরা। তারা যুক্তি দিচ্ছেন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে সরাসরি ভোটে নির্বাচনের সফল অভিজ্ঞতা সংসদেও অনুসরণ করা উচিত।

প্রতিক্রিয়া

সভায় নারীপক্ষ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ActionAid, সিপিডি ও ‘নিজেরা করি’র প্রতিনিধিরা বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্রে ‘নারী’ শব্দটি বাদ দেওয়া থেকেই বোঝা যায় মূল প্রবাহে তাঁদের ঠাঁই দিতে অনীহা রয়েছে। নিজেদের বক্তব্যে শাহীন আনাম ও খুশী কবির অভিযোগ তোলেন, ‘বয়েজ ক্লাব’ মানসিকতা ভেঙে না ফেললে রাজনৈতিক সংস্কার অর্থহীনই থেকে যাবে। গার্মেন্ট খাতে নারীর ৫০ শতাংশের বেশি অবদান তুলে ধরে তারা প্রশ্ন রাখেন, “মনোনয়নে ৫ শতাংশ দয়া কেন?” শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকর্মী নাজিফা জান্নাত সরাসরি ভোট না হলে তরুণী ভোটারদের ভরসা হারানোর আশঙ্কা জানান।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভিন হক সংসদীয় আসন ৩০০ থেকে বাড়িয়ে ৬০০ করার মধ্যে ৩০০ আসন দুই মেয়াদে নারীদের জন্য সরাসরি সংরক্ষণের প্রস্তাব দেন। তাঁর যুক্তি, “দুই টার্ম নারী আধিক্য থাকলে নেতৃত্ব তৈরির পথ খুলবে।” বদিউল আলম মজুমদার অকপটে বলেন, “আমরা সবাই দায়ী; পুরুষতন্ত্র জিতেছে।” সিপিডির গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম ভবিষ্যৎ সংসদে নারী প্রতিনিধি আরও কমে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেন, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা এটিকে “মাছের বাজারের দরকষাকষি” বলে সমালোচনা করেন।

গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা

• বর্তমান সংসদে নারী আসন: ৫০ (পরোক্ষ ভোট)

• রাজনৈতিক দলের প্রস্তাবিত নারী মনোনয়ন: ৫% মাত্র

• নাগরিক সমাজের দাবি: ৩৩–৫০% মনোনয়ন

• বিকল্প সুপারিশ: ১০০ থেকে ৩০০ সংরক্ষিত আসনে সরাসরি ভোট

• বাংলাদেশ জনসংখ্যা: প্রায় ৫১% নারী

এরপর কী

গোলটেবিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েক দিনের মধ্যে নারী অধিকার সংগঠনগুলো গণস্বাক্ষর সংগ্রহ শুরু করবে। স্বাক্ষর সংবলিত দাবি পত্র সরাসরি প্রধানমন্ত্রী ও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কমিশন যদি দ্রুত নতুন আলোচনার তারিখ ঘোষণা না করে, তাহলে কার্যালয় ঘেরাও ও প্রতীকী কালো ব্যাজ কর্মসূচির মত চাপ বাড়ানোর পদক্ষেপও বিবেচনায় আছে।

বৃহত্তর চিত্র

রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই অর্থনৈতিক খাতে নারীর অগ্রগতি থেমে নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ও কমিউনিটি ব্যাংকের সাম্প্রতিক রিফাইন্যান্সিং চুক্তি অনুযায়ী এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তারা স্বল্পসুদে নতুন তহবিল পাচ্ছেন। অধিকারকর্মীরা মনে করেন, অর্থনীতিতে যে গতিতে নারীরা এগোচ্ছেন, সংসদে তাদের অংশগ্রহণ না বাড়লে নীতি নির্ধারণে ‘বস্তুগত বিভাজন’ আরও প্রকট হবে।

More From Author

মব সন্ত্রাস দমনে অগ্রগতি নেই: অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরের পর্যালোচনায় বক্তারা

আট উপদেষ্টার দুর্নীতি অভিযোগে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য: বিএনপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যে উত্তাপ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *