ঢাবি হলে রাজনীতির ভবিষ্যৎ ঢাকায় জটিল আলোচনায়ই আটকে রইল

ঢাবি হলে রাজনীতির ভবিষ্যৎ ঢাকায় জটিল আলোচনায়ই আটকে রইল

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলোতে রাজনীতি চালু থাকবে কি থাকবে না—এ প্রশ্নে রবিবার (১০ আগস্ট) উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খানের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ১০টির বেশি ছাত্রসংগঠনের প্রায় চার ঘণ্টার বৈঠকে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ছাত্রলীগ থেকে ছাত্রশিবির—প্রায় সব পক্ষই বৈঠকে উপস্থিত থাকলেও গুপ্ত রাজনীতির বিরোধিতা এবং ‘শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতি’র কথা ছাড়া বাকিতে ঐকমত্য হয়নি। বৈঠকটি জরুরি হয়ে ওঠে কারণ সামনে ডাকসু নির্বাচন, আর তার আগে ১৮টি হলে ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়ায়।

পটভূমি

গত জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মৌখিকভাবে জানায়, হলে সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে। কিন্তু ৮ আগস্ট ছাত্রদল ১৮টি হলে নতুন কমিটি গঠন করলে রাতেই শতাধিক শিক্ষার্থী রাজু ভাস্কর্যে মিছিল করে ‘হলমুক্ত রাজনীতি’র দাবিতে স্লোগান তোলে। উপাচার্য তখন আশ্বাস দেন, আগের নিষেধাজ্ঞাই বহাল। এর চার দিন পরই রবিবারের বৈঠক ডাকা হয় যাতে ছাত্রলীগ-বাসদ-ছাত্র ইউনিয়নের একটি অংশ ছাত্রশিবিরের উপস্থিতি দেখে ওয়াক-আউট করে।

প্রতিক্রিয়া

বৈঠক শেষে ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন বলেন, “গুপ্ত রাজনীতি বন্ধ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি।” গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক আব্দুল কাদেরের বক্তব্য, “হল ও একাডেমিক এলাকায় প্রকাশ্য-গুপ্ত—দুই ধরনের রাজনীতিই নিষিদ্ধ করতে হবে।” বিপরীতে ছাত্রশিবিরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এস এম ফরহাদ জানান, “শিক্ষার্থীদের ই-মেইলের মাধ্যমে মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিন—এটাই আমাদের প্রস্তাব।” একই দিন চট্টগ্রামে এক অনুষ্ঠানে শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দাবি করেন, হল কমিটিতে ছাত্রলীগের ৫৪ জনের নাম ঢুকে পড়েছে, যা ‘রাজনীতির নৈতিক পতনের’ উদাহরণ। অন্যদিকে সাবেক ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বলেন, “গুন্ডা সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার কারণেই ছাত্ররাজনীতি ঘৃণার বিষয় হয়েছে; সংস্কার ছাড়া উপায় নেই।”

বৃহত্তর চিত্র

১৯৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাবি হল-রাজনীতি নানা সময়ে স্থগিত-আংশিক-পুনরায়-স্থগিতের চক্রে ঘুরছে। নিরাপত্তা, টর্চার সেল ও নিয়োগ-বাণিজ্যের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বড় অংশ এ-কে দায়ী করলেও দলগুলো হলে ‘রাজনৈতিক স্পেস’ হারাতে নারাজ। সামনে ডাকসু নির্বাচন ছাড়াও জাতীয় নির্বাচন রয়েছে; ফলে বড় দলগুলোর ছাত্রসংগঠন হল দখলে মরিয়া। ক্যাম্পাস পর্যবেক্ষকদের ধারণা—বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রশক্তির ‘ফিডার লাইন’ বন্ধ হলে প্রধান দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামোই চাপে পড়বে, আবার পুরনো সহিংসতা-ভয়ও ফিরে আসতে পারে।

এরপর কী

উপাচার্য জানান, “সব সংগঠনের লিখিত মতামত নিয়ে শিগগিরই একটি খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হবে, তারপর সিনেটে পেশ করা হবে।” প্রশাসন ই-মেইল ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতও নেবে বলে জানিয়েছে প্রক্টর দপ্তর। তবে বামপন্থী সংগঠনগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে—শিবিরকে বৈধতা দিলে তারা যে কোনও নির্বাচনী প্রক্রিয়া বয়কট করবে। অন্যদিকে ছাত্রদল বলেছে, হামলা-হেনস্তা বন্ধ না হলে তারা ‘আইনি পদক্ষেপে’ যেতে প্রস্তুত। সব মিলিয়ে ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে হল-রাজনীতির ভবিষ্যৎ এখন টানটান অনিশ্চয়তায়, যার সমাধান নির্ভর করছে প্রশাসনের কঠোরতার সঙ্গে ছাত্রদের নিরাপত্তা আর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর।

More From Author

ঢাকার বাসস্টপে যাত্রী ধরতে সহকারীদের টানাহেঁচড়া, নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিযোগিতায় ভোগান্তি বাড়ছে

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি: আবেদন সময় ১৫ আগস্ট পর্যন্ত, শিক্ষা কোটার নির্দেশনা জারি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *